ভারতের পতাকা তৈরির গল্প

 


আমাদের দেশে যে পতাকা রয়েছে সেই নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, তবে অবশেষে ঠিক হয় যে এই পতাকা উত্তোলন হবে 15 আগস্ট 1947 সালে। তবে আমাদের জাতীয় পতাকার একটা ইতিহাস রয়েছে। প্রথমে তো আলাদা কোনো পতাকার ঠিক ছিল না, এমনকি সিপাহী বিদ্রোহের সময় শুধু মাত্র দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ এর সবুজ রঙের পতাকা দেখানো হয়েছিল। তার ব্রিটিশ সরকার শাসন বাড়ে এবং পতাকা পাল্টানো হয়, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নয় পুরো ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসন করছে। শোনা যায় যে ভারতের প্রথম পতাকা তৈরি হয়েছিল কলকাতায় আর এই কথা বলা হয় যে 1883 সালে লাহোরে এক বাঙালি তৈরি করেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সোসাইটি, তাঁর নাম শ্রীশ চন্দ্র বসু। ওনার তৈরি সূর্যের প্রতীক দেওয়া পতাকা নিয়ে লাহোরের রাস্তায় মিছিল করেন ভারতসভার আদলে তৈরি এই সোসাইটির সদস্যরা। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, এই পতাকা উপনিবেশের অন্যান্য জায়গায় প্রচার পায়নি। 1906 সালে তৎকালীন ক্যালকাটা র পার্সি বাগান অঞ্চলে নতুন একটি পতাকা তৈরি হয়, তখন এদেশে চলছিল স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন। সেই সময় হেমচন্দ্র কানুনগো ও শচীন্দ্র প্রশাদ ঘোষ এই পতাকা ডিসাইন করে আর আমরা এই পতাকা দেখতে পাই যার ফলে এইটাই হয়ে যায় ভারতের প্রথম পতাকা।

The Calcutta Flag (1906) 

 এর ডিসাইন হলো এতে সবুজ, হলুদ ও লাল রঙের তিনটি অনুভূমিক ডোরা ছিল। উপরের সবুজ ডোরাটিতে ভারতের প্রদেশগুলির প্রতিনিধিত্বকারী আটটি সাদা পদ্ম ছিল; মাঝের হলুদ অংশে দেবনাগরী লিপিতে ‘বন্দে মাতরম’ লেখা ছিল; এবং নীচের লাল অংশে হিন্দু ও মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে একটি সূর্য ও একটি অর্ধচন্দ্র প্রদর্শিত হয়েছিল। যদিও কলকাতা পতাকাটি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি, এটি পরবর্তীকালের ভারতীয় পতাকাগুলিতে প্রতীকী রঙ এবং নকশা ব্যবহারের পথ তৈরি করে দিয়েছিল। এরপর হয় আরও অনেক ঘটনা যেমন পিটি নায়র ও কে ভি সিংহ আরও একটি পতাকা তৈরি করেন, 1907 সালে প্যারিসে নির্বাসিত ভিকাজি কামা জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে কলকাতা পতাকার একটি সামান্য পরিবর্তিত সংস্করণ উত্তোলন করেন। ম্যাডাম কামা এবং প্যারিসে নির্বাসিত অন্যান্য বিপ্লবীদের নিয়ে একটি নকশা তৈরি করা এই পতাকাটি বার্লিনের একটি সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনেও প্রদর্শিত হয়েছিল এবং বার্লিন কমিটি ফ্ল্যাগ নামে পরিচিতি লাভ করে। এটিই ছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রদর্শিত প্রথম ভারতীয় পতাকা।

The Berlin Committee Flag (1907)

 এই পতাকা তৈরি কারণ ছিল সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের তথা কলকাতায় বিভিন্ন অঞ্চলে সহজ ভাবে গড়ে তোলা। এই পতাকা টি কলকাতায় উত্তোলন করা হয় 1906 সালের আগস্ট মাসের সাত তারিখ, আর এটি প্রথম উত্তোলন করেছিলেন আর টি গ্রীয়ার, তিনি একসময় চেয়ারম্যান ছিলেন। এবার আরো একটু সরাসরি বলি 1917 সালে অ্যানি বেসান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলক আরো একটি নতুন পতাকার উত্তোলন করেন। 

The Home Rule Flag (1917)


এই পতাকা ছিল স্বরাজের প্রতিক আর এখানে তথাকথিত তিনটি রং ছিলনা, এই পতাকা ছিল লাল সবুজ ডোরাকাটা আর যেহেতু ভারতের ব্রিটিশ সরকার চলছে তাই ওদের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকার উপরে বাঁদিকে ছিল আর পতাকার উপর সাত তারা আঁকা ছিল যার মানে দাঁড়ায় সপ্তপুঞ্জ। এখানে পতাকা টািতে লাল সবুজ দেওয়া হয়েছিল কারণ ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আর তার জন্য আলাদা করে চিহ্ন দেওয়া হয়েছিল আর এখানে ব্রিটিশ পতাকার চিহ্ন ইচ্ছে করে ব্যবহার করা হয়। 

The First Swaraj Flag (1921)


1921 সালে গান্ধীজি তার ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় একটি পতাকার তৈরি কথা বলেন এবং একথা তিনি বলেন যে ওটা হবে ভারতের পতাকা এবং ঐ পতাকায় একটি চরকা থাকবে। এই কথা শুনে ব্রিটিশ বিরোধী এবং তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ও কর্মী পিংগালিয়া ভিক্যাইয়া একটি পতাকা ডিজাইন তৈরি করেন। 

পিংগালিয়া ভিক্যাইয়া


1921 থেকে 1929 সাল অবধি ঐক্যবদ্ধ হিন্দু ও মুসলমানদের প্রতীক হিসেবে লাল ও সবুজ ব্যানারের উপর চরকা সম্বলিত এই প্রস্তাবিত পতাকাটির নকশা ও তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো এবং তিনি তাই করেন। এই প্রতিকি পতাকারটির নাম হয়েছিল স্বরাজ পতাকা। এখানে বলে রাখা দরকার যে এখানে গান্ধীজি এই রং গুলির অর্থ উন্মোচন করেন লাল রঙ জনগণের আত্মত্যাগের, সাদা শান্তি ও পবিত্রতার এবং সবুজ আশার প্রতীক। এটিই ছিল আজকের তিরঙ্গার মতো প্রথম ত্রিবর্ণ পতাকা। পরবর্তিকাল এই পতাকা একটু পাল্টানো হয়, 1931 সালে সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য এই পতাকা রং পাল্টেনো হয় ত্রিবর্ণ পতাকা গ্রহণ করে, যার শীর্ষে ছিল গেরুয়া—সাহস ও ত্যাগের প্রতীক; মাঝখানে সাদা—সত্য ও শান্তির প্রতীক; এবং নীচে সবুজ—বিশ্বাস ও বীরত্বের প্রতীক।

The Second Swaraj Flag of Indian National Congress (1931)


 কেন্দ্রে ছিল চরকা —যা ছিল ভারতীয় আত্মনির্ভরশীলতার গান্ধীর চিরন্তন প্রতীক। এই 1931 সালের সংস্করণটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বহুল স্বীকৃত প্রতীক হয়ে ওঠে । 1947 সালে ভারতের গণপরিষদ একটি জাতীয় পতাকা নির্বাচনের জন্য একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। এই কমিটির প্রধান ছিলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং এতে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, সরোজিনী নাইডু, সি. রাজাগোপালাচারী, কে. এম. মুন্সি এবং বি. আর. আম্বেদকরের মতো বিশিষ্ট সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কমিটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের স্বরাজ পতাকাটি ভারতের জাতীয় পতাকা হিসাবে গৃহীত হোক, তবে কিছু পরিবর্তনসহ যাতে এটি সকল দল ও সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। স্বরাজ পতাকার চরকার পরিবর্তে অশোকের সিংহস্তম্ভ থেকে অশোকচক্রকে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এও স্থির করা হয় যে পতাকায় কোনো সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত থাকবে না। 



জওহরলাল নেহেরু গণপরিষদে জাতীয় পতাকার প্রস্তাব করেন। এই নকশায় সমান অনুপাতে গাঢ় গেরুয়া, সাদা ও গাঢ় সবুজ রঙের একটি অনুভূমিক ত্রিবর্ণ রয়েছে এবং সাদা অংশের কেন্দ্রে নীল রঙের অশোকচক্র স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয় এবং তিরঙ্গা বা ত্রিবর্ণ পতাকাটি 1947 সালের 15 আগস্ট থেকে 1950 সালের 26 জানুয়ারি পর্যন্ত অধিরাজ্য ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং তখন থেকে এটি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পতাকা হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার যে সুভাষচন্দ্র বসু এই একই পতাকা নিজের জায়গায়া রেখেছিল ঠিকই কিন্তু চক্রা জায়গায় তিনি ভারতের জাতীয় পশু বাঘ রেখেছিলেন। বলে রাখা দরকার যে এই নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। এই ছিল আমাদের পতাকা!

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - A History of India’s Flag: How Parallel Freedom Struggles Shaped The Tiranga | Homegrown India https://share.google/6DQuMH2uIEThXvoVA


‘সাত’কাহন – ২২ : কলকাতায় উত্তোলন হয়েছিল প্রথম জাতীয় পতাকা??!! – কলকাতার 'সাত'কাহন https://share.google/5EYaVmCXF7Yc8tSFa



Comments