পান্ডুয়ার অন্য ইতিহাস

কুতুব শাহী  মসজিদ 

 

বাঙালি একসময় ভারত শাসন করতো, তেমনি তাদের রাজধানী ছিল বিভিন্ন জায়গায়। এই বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা। তেমনি ব্রিটিশ সরকার কলকাতা কে রাজধানী বানিয়েছিলেন তার আগে সিরাজউদ্দৌলার মুর্শিদাবাদ কে রাজধানী তৈরি করেছিল তার আগে মালদা ছিল রাজধানী। তবে এক সময় বর্তমান মালদার পান্ডুয়া ছিল রাজধানী। তবে একটি সময়ে পান্ডুয়া ছিল রাজধানী এবং বিভিন্ন সাধকের জায়গা। বিভিন্ন নথি থেকে জানা গেছে পান্ডুয়াতে নূর কুত আলম এবং জালালুদ্দিন তাবরিজি এই জায়গায় নিজেদের বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন। মুসলিম সাধকরা এই জায়গাটিকে বিভিন্ন উপাধি দিয়েছিলেন শুধু তাই নয় এই জায়গাটি পরিচিত ছিল হজরত হিসাবে এখানে বিভিন্ন মুসলিম সাধকের কবর স্থান রয়েছে, যার ফলে জায়গাটি মুসলিম মানুষদের তির্থস্থান হয়েছে। এটি একসময় ইলিয়াস শাহীর রাজত্বের মধ্যে পড়তো। শেরশাহ এর টাকার কল ছিল এই খানে বলে মনে করা হয়। জানা গেছে ইলিয়াস শাহ এর আগে এই রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, তিনি গৌড় থেকে রাজধানী সরিয়ে পান্ডুয়া তে আনেন তার সময়ে একে বলাহত ফিরোজাবাদ। সেই সময় টাকার কয়েনের মাধ্যমে এই কথা বলা হয়ছে। সময়টা ছিল বড়ই অদ্ভুত কারণ দিল্লি থেকে বাংলার দুরত্ব অনেকটাই ছিল, সেই সময় দিল্লির শাসকরা ব্যাস্ত ছিলেন মঙ্গোল আক্রমণকে প্রতিহত করতে যারফলে বিভিন্ন জায়গায় শাসকরা নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। এবং নিজেদের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। চতুর্দশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলার তিনটি নগর রাজ্যের উত্থান ঘটে, এই তিনটি মধ্যে ছিল সপ্তগ্রাম, সোনারগাঁও এবং গৌড়। এই তিন স্থানীয় শাসকদের মধ্যে লড়াই চলতো যতদিন পর্যন্ত শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিজেকে বাংলার শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করেন, অবশেষে এই ঘটনা ঘটে আনুমানিক 1287 সালে যখন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিজেকে বাংলার শাসক ঘোষনা করেন। দিল্লির সম্রাট বিভিন্ন পন্থায় বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় কিন্তু বারবার তাদের অসফল হতে হয়। মহম্মদ বিন তুঘলকের ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলক বার বার বাংলাতে শাসন করতে চায় কিন্তু প্রতিবারই তিনি অসফল হয়। বলা যেতে পারে বাংলা সবসময় স্বাধীন ছিল, আকবরের সেনাপতি খানজাহান ও স্বাধীন রেখেছিল বাংলাকে। প্রায় 114 বছরে ইলিয়াস শাহ এর বংশধররা এখানে শাসন করেছেন এবং এই রাজত্বের সময় নটি রাজা হয়েছে এই বংশের। রাজা গণেশ এবং তার ছেলে ও নাতি ও এই বংশের ছিল। এখানে তারা অনেক মসজিদ,প্রাসাদ, দুর্গ, সেতু, সমাধিসৌধ নির্মাণ করেছিলেন, যার অনেকগুলি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে অথবা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেছে কালের নিয়মে। ইলিয়াস শাহী রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক সুলতান আবুল মুজাহিদ সিকান্দার শাহ 1373 খ্রিস্টাব্দে ঐ এলাকায় অনেক মসজিদ ও গম্বুজ তৈরি করেছেন। জানা গেছে তিনশোটির বেশি মসজিদ তৈরি করেছিলেন কিন্তু এখন আর সেগুলো দেখা যায় না সবই ভেঙে ফেলা হয়েছে, জানা গেছে তাঁর নির্মিত মসজিদ গুলির মধ্যে হিন্দু ও বৌদ্ধ কাঠামোর পাথর পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয় এর মধ্যে পাল ও সেন যুগের শিল্প কর্ম স্থান পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য ভাবে বলা যায় সেই সময় স্থাপত্য গুলি তে পোড়া মাটির অবস্থান বেশী ছিল, কারণ আমাদের সমতল ভূমি এবং পলি মাটির জন্যে পাথরের ব্যবহার খুব কম হতো আর সেই কারণেই মন্দির গুলিতে পোড়া মাটির অবস্থান অত্যন্ত বেশী ছিল এই কারণে টেরাকোটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়ে ছিল, এই লোকশিল্পের উন্নতির মূলে ছিল মসজিদগুলি।ইলিয়াস শাহী উত্তরাধিকারসূত্রে মাত্র একবার খুব অল্প সময়ের জন্য থেমে গেছিল, রাজা গণেশ সেই সময় রাজা হয়েছিলেন 1414 থেকে 1418 সালে এবং তিনি কার্যক্রমে king maker ভুমিকা নিয়ে ছিলেন এবং ছোট ছোট পুতুলের মত রাজ্য শাসন করতেন। কিন্তু তার সময়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং বিভিন্ন বিদ্রোহ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাজা গণেশ রাজত্ব তার ছেলে যদু হাতে তুলে দেয়,যদু মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে এবং তার নাম হয় জালালউদ্দিন। তার সময়ে মসজিদ গুলি নতুন ভাবে বানানো তৈরি হয়, এই সময় বাংলা স্টাইলে মসজিদ গুলি তৈরি হয়।

ফাতেহ খানের সমাধি

 

 মানে এই সময় সম্ভবত বাংলায় সাধারণত দেখা যায় এমন খড়ের বাঁশের কুঁড়েঘর থেকে এসেছে, যেখানে খড়ের ভারে বাঁশ স্বাভাবিকভাবেই বেঁকে যায়। এটি হল 'বাংলার ছাদ'-এর নমুনা, যা এখন ডজন ডজন মুঘল স্মৃতিস্তম্ভে দেখা যায়। এখানে আরও একটি জিনিস উল্লেখযোগ্য, তার মুদ্রায় দিল্লির কোনো অংশের ছাপ দেখা যায় না, দেখা যায় সিংহ, হিন্দু দেবী 'চণ্ডী'র পর্বতও রয়েছে। বলে রাখা দরকার যে বাংলার মানুষ সিংহ দেখেছিল প্রথম চিড়িয়াখানায়, তাদের কাছে সিংহ বলতে ছিল ঘোড়া রুপি সিংহ, কিন্তু যখন তারা আসল সিংহ দেখল তখন বুঝতে পারলো কতটা আলাদা। শুরু তে দুই মুসলিম সাধকের কথা বলেছিলাম তাদের কথা আবার একটু বলা দরকার জালালুদ্দিন তাবরিজি এবং নূর কুতুব আলম পান্ডুয়া তে যখন এসেছিলে তখন লক্ষন সেনের রাজত্ব চলছে, জালালুদ্দিন তাবরিজি ছিলেন সুফি সাধক তিনি লক্ষন সেনের কাছে অনুমতি নিয়েছিলেন পান্ডুয়ায় বসতি স্থাপন এবং এলাকার লোকদের কাছে ধর্মপ্রচার করার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই সময় তারা কয়েকটি দারগা প্রতিষ্ঠা করেছিল তার মধ্যে ছোট দরগা বা ছোট দরগা থেকে আলাদা করার জন্য দরগাটি বড়ি দরগা বা বৃহত্তর দরগা নামে পরিচিত, যা হযরত নূর কুতুব-উল-আলমের সাথে সম্পর্কিত।

ছোটি দারগা 


 এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারে এটি যদি রাজধানী তাহলে একটি ও কেল্লা দেখা যায় না কেন ? এর জন্য দায়ী আমাদের জলবায়ু এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাংলার জলবায়ু, যার উচ্চ আর্দ্রতা এবং প্রচুর বর্ষাকাল, ইটের তৈরি ভবনের টিকে থাকার জন্য আদর্শ নয়। এটি গাছপালার দ্রুত বৃদ্ধিকেও উৎসাহিত করে এবং একবার একটি বটগাছ একটি ভবনে স্থান করে নিলে, এটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। উনিশ শতকে বাংলা একাধিক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল, যার ফলে অনেক ঐতিহাসিক মসজিদের গম্বুজ ভেঙে পড়েছে। এভাবেই পান্ডুয়ার কথা মনে রেখেছে ইতিহাস 

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - https://share.google/OEAOJjlegbsOLUVM5


Comments