মারাঠিদের তৈরি বাংলায় মন্দির

মুর্শিদাবাদ শিব মন্দির 

 

ছোট বেলায় সব বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর সময় একটা ছড়া খুব প্রচলিত ছিল, 

খোকা ঘুমালো, পড়া জুদালো, বর্গি এলো দেশে,

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেবো কিসে?

ধান ফুরোলো, পান ফুরোলো, খাজনার ওপে কি?

আর কোটা দিন শোবুর করো, রোশুন বুনেছি।

এই ছড়াটা শোনা নো হতো। তবে এই ঘটনা কিন্তু সত্যি ছিল বর্গীরা বাংলা আক্রমণ করেছিল, এবং বহু লোক এর জন্য প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু যখন এই শুরু হয় বা শুরু হয়েছিল তখন বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। সেই সময় বাংলার নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলি খান এবং পরবর্তীতে তার উত্তরসুরী এবং জামাই সুজা-উদ-দীন মোহাম্মদ খান, তার নাম অনুসারে পরবর্তি কালে জায়গাটির নাম হয় মুর্শিদাবাদ। এর আগে এই জায়গার নাম ছিল মুকুসবাদ, যেটি তৈরি হয়েছিল মুর্শিদকুলি খান এর নাম অনুসারে। তিনি এই মুর্শিদাবাদ কে তৎকালীন বাংলার রাজধানী বানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে মারাঠি ডাকাত বাহিনীর কথা উল্লেখ করলাম কেন! কারণ মুর্শিদাবাদে একটি শিব মন্দির আছে যেটা প্রতিষ্ঠীত করেছিল মারাঠারা। এই মন্দির কথা টুরিস্টদের জন্য বিশেষ বিখ্যাত। এই মন্দিরটি রয়েছে ভাগীরথী নদীর পশ্চিম দিকে রোশনী বাগে যেখানে শায়ীত আছে নবাব সুজা-উদ-দীন মোহাম্মদ খান। এই বাগান টি তৈরি হয়েছিল নবাবের আনন্দের জন্য। যদিও এই বাগানে বেশি মানুষ আসে না, বেশিরভাগ সময় সবাই যায় খোশ বাগে যেখানে শায়িত রয়েছে নবাব আলিবর্দী খান এবং সিরাজউদ্দৌলার সমাধি। এই মন্দিরটি ছোট মন্দির,এর নাম হলো এক লিঙ্গ শিব মন্দির। এই মন্দিরটির যেই সময় তৈরি হয়েছিল সাতেরো শতকে সেই সময়, ইসলামক স্থাপত্যে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়। মন্দিরটিতে রয়েছে একটি কন্দযুক্ত গম্বুজ রয়েছে, প্রতিটি কোণে চারটি ছোট মিনার রয়েছে। যার ফলে মন্দিরটর সঙ্গে অনেক মুসলিম স্থাপত্যের মিল রয়েছে, কেন এর কথা আগেই বলেছি। মন্দিরটিটে ঢুকতে হয় দক্ষিণ দিকে দিয়ে, মন্দির মধ্যে একটি ছোট খিলান এবং বারন্দা রয়েছে, এছাড়া এখানে অলংকরণীয় স্তম্ভ দ্বারা বেষ্টিত একটি ইসলামী-প্রভাবিত স্ক্যালপড খিলানের মধ্য দিয়ে গর্ভগৃহের দরজা খোলে। খুলেই দেখতে পাওয়া যায় ফুল দিয়ে বেষ্টিত হিন্দু দেবতা শিব লিঙ্গ। মজার ব্যাপার হলো এখানেই একটি কালো গ্রাফাইটের উপর লেখা হয়েছে শীলালিপি, প্রথম দিকে এই শীলালিপির উপর চোখ বলালে মানে শীলালিপির ভাষাটা হিন্দি, পরবর্তী কালে পন্ডিত ব্যাক্তিরা অনুসন্ধান করে জানায় যে একটা হিন্দি ভাষায় নয় মারাঠি ভাষায় লেখা। মারাঠি ভাষায় কী লেখা আছে সেই বিষয়ে আলোচনা করেছেন মারাঠি বিশেষজ্ঞরা এখানে বলা হয়েছে বা জানা গেছে এখানে হাতির মুখের অবয়ব দেখা গেছে যার ফলে,এটা যে গণেশ ঠাকুর এইনিয়ে মতবিরোধ জায়গা নেই। দ্বিতীয় গণেশ ঠাকুর সঙ্গে মারাঠাদের নিবিড় সংযোগ রয়েছে। এই শিলালিপি থেকে জানা গেছে এই মন্দিরটির নাম 'রঙ্গনাথেশ্বর মহাদেব' মন্দির আর এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রঙ্গনাথ পণ্ডিত। এই শিলালিপি থেকে আরো জানা যাচ্ছে যে এখানে যে শৈব রিতীনিতির কথা লেখা আছে, তার সঙ্গে কর্নাটকের শৈব রিতীর খুব মিল পাওয়া যায়। এখানে আরো বলা হয়েছে যে রঙ্গনাথ পণ্ডিত একজন মুন্সি ছিলেন মানে তৎকালীন সময়ে জমিদার বা বড় মানুষদের হিসাব রক্ষক যারা করতেন তাদের মুন্সি বলা হতো এমনকি সচিব, লেখক, বা কেরানি প্রমুখ ব্যক্তি কে এই পদে ভুষিত করা হতো এটি একটি ফার্সি শব্দ মোগল আমলে এই শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়েছিল।ব্রিটিশ আমলে ভাষা শিক্ষক বা পণ্ডিতদের জন্যও ব্যবহৃত হতো। মুন্সি মানে কিন্তু কেরানি ও বটে সেক্ষেত্রে এই শিলালিপি তে কোম্পানি শব্দটি দেখা গেছে তাহলে কোম্পানি হিসাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কে ধরে নেওয়া যেতেই পারে, এমনকি রঙ্গনাথ পণ্ডিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কেরানি ছিলেন এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। 1757 পর মানে পলাশি যুদ্ধের পর ব্রিটিশ মুর্শিদাবাদ জেলার যথেষ্ট ব্যবহার করে,তারা মুর্শিদাবাদ থেকে এগারো কিলোমিটার দূরে একটা কারখানা তৈরি হয়, কারণ মুর্শিদাবাদে ভালো সিল্ক তৈরি হতো এছাড়াও ওখানে হাতির দাঁতের উপর খুব সুন্দর কাজ করা হতো সেই সময়। কলকাতার ডাক ব্যবস্থা এই মুর্শিদাবাদের মধ্যে দিয়ে যায়, কলকাতা থেকে পাটনায় পাঠানো কোনো চিঠি এই মুর্শিদাবাদ হয়েই যেত। তৎকালীন সময়ে এই রাস্তার দুরত্ব ছিল 398 মাইল এবং সেটাকে ভাগ করা হতো 48 ধাপ অনুযায়ী। এই ডাক যেত মুর্শিদাবাদের মধ্যে থেকেই এই 48 ধাপ কে 8-9 মাইলে বিভক্ত করা হতো, রানার রা এই পথ অতিক্রম করতো তবে দুজন থাকতো একজন আলো দিত অন্য জন ঢাক বাজাতো যার ফলে বন্য জন্তুরা ভয় পেয়ে যেত। এই 48 ধাপের মধ্যে চারটি রাজধানী পড়তো মুর্শিদাবাদ, রাজমহল, মুংঙ্গের এবং পাটনা ছিল। এইসব রুটিন ঠিক করে একজন কেরানি, তাহলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে ঐ কেরানি ছিলেন রঙ্গনাথ পণ্ডিত। মন্দিরে ঢোকার গর্ভগৃহে ধোঁকার সময়ে শিলালিপি তে দেওয়া সাল অনুযায়ী 2007 তবে সেটা ঠিক করার সাল। 

মারাঠি শিলালিপি 


এখন অনেকেই একটি প্রশ্ন করবেন যে কেন মারাঠি মুন্সি বাংলায় এসেছিলেন? এই কথা আমরা ব্রিটিশদের জিজ্ঞেস করলাম না কেন! কারণ প্রথম প্রশ্নটার উত্তর সোজা, কারণ সেই সময় বা এখনকার যুগেও কাজের জন্যে মানুষকে নিজের বাড়ি ঘর দেশ ছেড়ে অন্য জায়গায় যায় ঠিক ঐ সময় তাই হতো এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মালাদায়া সিল্ক কারখানায় যোগ দিয়েছিলেন একজন,যিনি অযোধ্যার আউধ থেকে এসেছিলেন। একইভাবে, রঙ্গনাথ পণ্ডিতও কাজের সন্ধানে মুর্শিদাবাদে চলে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে 1742 সালে বাংলায় বর্গি ভাষ্কর পন্ডিতের নেতৃত্বে বর্গি আক্রমণ শুরু হয় এর এসেছিল পাঞ্চেটের মধ্যে দিয়ে, এদের একটা দাবি ছিল চৌথা। এটি ছিল একধরনের কর সেটা নাকি বাংলা দিত না,আর সেই জন্যই বর্গি আক্রমণ শুরু হয়।

মন্দিরের ভেতরে 


 বলা হয় আলিবর্দী খা এসে উড়িষ্যার নবাব রুস্তম জঙ্গ কে উড়িষ্যার নায়েব এর পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এবং মীর হাবিব ছিলেন দরবারি তিনি চেয়েছিলেন রুস্তম জঙ্গ মারাঠা বর্গি বাহিনী কে সাহায্য করে যার দুপক্ষের একজন শত্রু হলো আলিবর্দী খা। একদশক ধরে এই বর্গী আক্রমণ চলে বাংলায়, আলিবর্দী খা ভাস্কর পন্ডিত এক সাজানো শান্তিপূর্ণ আলোচনা হত্যার পর এই বর্গি আক্রমণ চলে। অবশেষে 1751 সালে মারাঠাদের হাতে উড়িষ্যা কে তুলে দেওয়া হয়। মারাঠা দের অশ্বারোহী বাহিনী উড়িষ্যায় তাদের গেরিলা যুদ্ধের প্রচলন করে, এই গেরিলা যুদ্ধ শেখায় একসময়ের আফ্রিকার দাস মালিক আম্বর, ইনি নামকরণ করেছিলেন ' বর্জির-গিরি', যেখান থেকে বাংলা শব্দ 'বর্গি' এসেছে। বর্গিদের এখনও একটি খুব জনপ্রিয় বাংলা ঘুমপাড়ানি গানে স্মরণ করা হয়। এখনো অনেক মানুষ নিজেদের বর্গিদের বংশধর মনে করেন ইটাচুনার জমিদার পরিবার রয়েছে, যাদের প্রাসাদ রণবীর সিং-এর লুটেরা ছবিতে দেখা গিয়েছিল। এখানে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন পুর্ণচন্দ্র মজুমদার তার বইতে উল্লেখ করেছেন সেই এই মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে এক মারাঠি পন্ডিত মারা, তখকার প্রথা ছিল সতীদাহ,ব্যাস মৃত পন্ডিতের সতেরো বছরের স্ত্রী কে নিয়ে আসা সতীদাহ জন্যে কিন্তু লেডি রাসেল সেটা হতে দেয়নি ইনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাশিমবাজারের ফেক্টিরির চিফ স্যার ফ্রান্সিস রাসেল স্ত্রী। তিনি বারবার বোঝানো চেষ্টা করেছিলেন সেই মেয়েটিকে যে এটা ভুল সিদ্ধান্ত কিন্তু তাকে হার মানতে কারণ মেয়েটি আত্মহত্যা করে তার সাক্ষী ছিল হোলওয়েল, হ্যাঁ জিনি অন্ধুকূপ হত্যার কথা উল্লেখ করেন।ঘটনাটি যেখানে ঘটেছিল সেই স্থানটি 'সতী চৌরাহা' নামে পরিচিতি লাভ করে। এই ঘটনার স্মরণে একটি মন্দির নির্মিত হয়েছিল, যদিও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মন্দিরটির অবস্থা খারাপ ছিল। মজুমদার লিখেছেন যে তাঁর বই প্রকাশের সময় পাথরের দরজার ফ্রেম এবং স্মারক ফলকটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। স্থানীয়রা কিছু সময় আগে বন্যার কথা বলে, যা সতী চৌরাহা ক্রসিংকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল এবং আজ মন্দিরটি কোথায় ছিল তা নির্দিষ্ট করা অসম্ভব।

সেই বই

মুর্শিদাবাদের স্মৃতিস্তম্ভগুলির একমাত্র বিস্তৃত অধ্যয়ন মজুমদারের বই। তিনি রোশনিবাগের রঙ্গনাথেশ্বর মন্দিরের শিলালিপিও অধ্যয়ন করেছিলেন এবং তাঁর অনুবাদে তিনি একটি লাইন যুক্ত করেছেন যা আজ দৃশ্যমান নয়। শিলালিপির শেষে, আরও একটি লাইন ছিল, যা মন্দিরটিকে 'মহা ফাল্গুন সন ১২২৬ বাঙ্গালা' বলে উল্লেখ করেছে। মন্দিরের তারিখটি বিক্রম সংবৎ এবং বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারে লেখা হয়েছিল, এই বিষয়টি ইঙ্গিত দিতে পারে যে রঙ্গনাথ পণ্ডিত তাঁর বসবাসকারী বাঙালি সমাজে মিশে গিয়েছিলেন। এখন মানুষ মনে রেখেছে এই মন্দিরকে

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - The Concrete Paparazzi: A Maratha Temple in Murshidabad https://share.google/eRhfOnMYeZlQGFcJ8


 




Comments