চীনাদের নতুন বছর

সাধু এবং সেই জন্তু 


 আমাদের কলকাতার তথা বাঙালিদের মধ্যে বারো মাসে তেরো পার্বণ বলে একটা ব্যাপার আছে! জানুয়ারি মাসেই গেল ইংরেজি নতুন বছর আবার এপ্রিল মাসে আসবে বাঙালির নতুন বছর। তাহলে ফেব্রুয়ারি মাস কেন বাদ যাবে? কারণ তখন আসবে চিনা নিউ ইয়ার। হ্যাঁ আমাদের বাংলার চীনা পাড়া গুলিতে এখনো নতুন বছর উদযাপন করা হয়। আসলে চীনারা কিন্তু প্রথম কলকাতায় এসেছিল, টং অছি কলকাতায় আসে এবং জমি কিনে ব্যবসা শুরু করে তার সাথে অনেক চীনারা কলকাতায় এসেছিল। এই সব হয়েছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে টং অছি তো ওয়ারেন হেস্টিংস কাছ থেকে জমি কেনেন তার চিনি ব্যবসা শুরু করার জন্য। আসলে আখের রস থেকে যে মন্ড তৈরি হয় তার রং হলো বাদামি এবার চীনারা ঐ বাদামি মন্ড টিকে সাদা ধবধবে রঙে তৈরি করে আর ভেবে একে আমরা চিনি বলি কারণ কী চীনারা তৈরি করে তাই?! কিন্তু এখন আর অছিপুর চীনা দেখা যায় না কারণ, চিনি কল তৈরি পরে বিভিন্ন দিকে এটি ছড়িয়ে যায় এমনকি চীনা শ্রমিকদের বেশিরভাগ অংশ টেরেটি বাজার ও ট্যাংরায় চলে আসে। যার জন্য চীনা টাউন বলতে এই দুই জায়গাকে বোঝানো হয়। এবার আসি চিনেদের নতুন বছরের কথায়, তবে চীনাদের নতুন বছর নিয়ে দুটি গল্প প্রচলিত আছে। প্রথম গল্পে বলা হয়েছে যে নিয়ান নামক যন্তু পাহাড় থেকে নেমে আসে ঠিক নতুন বছরের আগেরদিন এবং সাধারণ মানুষ কে বিভিন্ন ভাবে ভয় দেখায়, এই রকম পরিস্থিতিতে এক ঋষিকে সবাই জিঞ্জেস করে কী করা যায়, তখন তিনি বলেন যে লাল রঙের কাগজ রাতে বাড়িতে লাগিয়ে রাখতে, সেই যন্তু লাল রঙ কে ভয় পায়। আরো জানা যায় যে জোরদার আওয়াজ কে নাকি ভয় পেত, সেই জন্য গ্রামবাসীরা পটকা ফাটাতো এবং এই একই সঙ্গে জোরে ঢোল বাজাতো। আর দ্বিতীয় গল্পে জানা যায় ঐ ঋষি সেই সেই জন্তু নিয়ন কে আহ্বান করে যে তুমি মানুষ দের ছেড়ে দিয়ে অন্য সব প্রাণী কে খেয়ে নাও, এই আহ্বানে রাজি হয় নিয়ান। নিয়ান হাঁ করে সব জন্ত জানোয়ার যখন গিলতে থাকে, তখন তারা নিয়ান আক্রমণ করে যার ও নিয়ানের শক্তি কমে যায়।এর ঐ ঋষি তাকে তার আয়ত্বে নিয়ে নেয় এবং সবাইকে বলে এই নিয়ম তারা প্রতিবছর পালন করে। চীনাদের আবার এই নতুন বছরের সময় অনেকি রীতি নীতি জড়িয়ে আছে, যেমন অনেক চীনা পরিবার আছে যারা তাদের গুরুজনদের সম্মান জানিয়ে নববর্ষ উদযাপন করে। ওখানে দেখা যায় গুরুজন পচ্ছন্দমত খাবার এবং ছয় বড় বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে তাদের কে মনে করা হয়, আগেই বলেছি তাদের পচ্ছন্দমত খাবার তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। অনেক তাদের গুরুজনদের উদ্যেশ্যে প্রিয় মদ দেয়! চীনাদের নববর্ষের অন্যতম হোল সিংহের নাচ, এই সিংহের নাচ শুধুমাত্র ট্যাংরা অঞ্চলে দেখা যায় এটি শুরু চীনা কালিবাড়ি থেকে রাত এগারোটার সময়। 
চীনা কালী মন্দির 



চীনা ড্রাগনের নাচ

এখানে এই নাচের জন্য প্রাইজ দেওয়া হয়। তবে শোনাচ্ছে খুব সহজ আসলে কিন্তু তা নয় যারা এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তাদের জন্য আতসবাজি ফাটিয়ে ধোঁয়া করে দেওয়া হয়, তার মধ্যে চারিদিকে ঢোল বাজিয়ে মাতিয়ে রাখেন চীনা পরিবার গুলি। যার ফলে এই চীনা সিংহের নাচের গ্রুপ গুলি খুব সহজে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জেতা মুশকিল। তবে আগে একলাখের বেশি বাজি ফাটানো হতো, হয়তো এখন নিশ্চয়ই সবুজ বাজি ফাটানো হয় হয়তো। 

ধোঁয়ার মধ্যে নাচ


এই সিংহের নাচ চীনা ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ, চীনা সিংহের নাচ তাদের নববর্ষের অন্যতম অঙ্গ সেদিন তারা তাদের মন্দিরের আর্শীরবাদ নিয়ে কলকাতা চায়না টাউন গুলি তে সকাল থেকে বাজনা বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তবে ঘুরে বেড়ায় বললে ভুল হবে, কারণ তারা চায়না টাউন এর প্রতিটা বাড়িতে গিয়ে লেটুস পাতা সংগ্রহ করে। তবে হাতে হাতে লেটুস পাতা সংগ্রহ হয়না এই সিংহ নিচের দল গুলো লেটুস পাতা সংগ্রহ করে বাড়ির মালিক জানালা দিয়ে বাঁসের লাঠির মধ্যে এই লেটুসপাতা ঝুলেিয়ে রাখে তার সঙ্গে থাকে একটি লাল রঙের খাম থাকে বলাই বাহুল্য এরমধ্যে টাকা। নাচ দেখিয়ে এই পাতা তাদের খেতে হয়, এবার দোতলা তিন তলা বাড়ি ক্ষেত্রে এই লেটুসপাতা কীভাবে খেতে হয় আর লাল খাম নিতে হয় সেটাই ভেবে দেখুন, একে বলে হাং পো।

ছবি দেখা যাচ্ছে এই হাং পো


 যদি জন্মাষ্টমী তে এক উপর আর একজন উঠে যেভাবে ঠিক সেভাবেই এই কাজ করা হয় লক্ষ্য করার বিষয় হলো দুই ক্ষেত্রেই কিন্তু বাজনা বাজে। নববর্ষের আগের দিন চীনাদের পরিবারের একসঙ্গে বসে খাওয়া দাওয়া হয় এমনকি অনেক বেশি করে রান্না করা হয় নববর্ষের আগের দিন। যদি খাবার থেকে তবে সেটা চীনাদের কাছে শুভলক্ষণ। মাছ চীনাদের অন্যতম প্রাচুর্যের বিষয়, মাছ কে তারা প্রাচুর্য হিসেবেই দেখে। চীনাদের নববর্ষের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাদের দেবতাদের আর্শীবাদ পাওয়া সেই জন্য তারা বাড়ির দরজায় লাল কাপড় দিয়ে সাজিয়ে রাখে এবং শুভ কামনা কাগজ এবং লাল রঙের লন্ঠন ও কমলা এবং ট্যানজারিনের সাথে শুভকামনা লেখা কাগজের স্ট্রিপগুলিও ঝুলানো হয়। জানা গেছে চীনা বাড়ি গুলি তে তাদের দরজার পাশে দ্বার দেবতার ছবি দেখতে পাওয়া যায় এই দেবতার নাম হলো মেনশেন। দরজার উপর ও বাড়ি মধ্যে লাল কাগজে শুভ কামনা লেখা থাকে সেটি হলো লাই সি, হং বাও, আং-পাউ। চীনারা নববর্ষের পর দুই রবিবার কলকাতার চীনা মানুষরা অছিপুরে যায় পৃথিবীর দুই দেব দেবী কে মোমবাতি জ্বালিয়ে আরাধনা করা হয়

থু তাই কুং এবং তার স্ত্রী, থু তাই ফো


 এছাড়া টং অছির কবরের উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হয় কারণ কেউ তো ভুলতে পারে না যে ঐ মানুষটির তারা কলকাতায় তথা ভারতে এসেছিলেন, এই কথা জানা যায় ভারত চীন যুদ্ধ সময় অর্থাৎ 1967 সালে অছিপুরে নদীর উপর একটি জাহাজ রাখা হয় সেখানে চীনারা নববর্ষ পালন করতো এমনকি জাহাজের মধ্যে জুয়া খেলার জায়গা ছিল তবে ওগুলো সব অতীত এখন নদীর উপর চড় পড়ে গেছে তাই আর মানুষ অতীত কে মনে করতে চায় না। এই ভাবে এখনো চলছে চীনা নববর্ষ উদযাপন আমাদের কলকাতায়।

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - https://www.getbengal.com/details/kolkata-s-chinese-new-celebrations-behind-the-lens

https://share.google/9kcaba3IFa3rhyh4j


Comments