টিপু সুলতানের সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক

টিপু সুলতান এবং কলকাতা 

 

আমাদের প্রিয় কলকাতা তথা তিলোত্তমা সঙ্গে বিভিন্ন মানুষের যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি অনেক নামের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ রয়েছে। বলাই যেতে পারে যে কলকাতার সঙ্গে টিপু সুলতানের একটা যোগাযোগ আছে। বলাই বাহুল্য যে কোথায় কলকাতা আর কোথায় টিপু সুলতান! কিন্তু একটা যোগাযোগ যে রয়েছে, আসলে যোগাযোগ এর কারণ হলো টালিগঞ্জ। জানা গেছে এখন আমরা যাকে টালিগঞ্জ বলে জানি সেই জায়গাটির আগের নাম ছিল রসাপাগলা। এখানে তখন জঙ্গল ছিল এবং কিছু ইউরোপীর দের বাড়ি ছিল। তবে বলাহয় নামটি একটি গাছ থেকে এসেছে আবার অন্যদিকে বলা হয় ওখানে একসময় একটি গ্রাম ছিল, এবং সেখানে একটি বাবার আশ্রম ছিল সেই বাবার নাম ছিল রসাপাগলা। এর উপর আরো একটি নামের থিয়োরি জানা যায়, সেটা হলো দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে একটাই পাগলা গারদ ছিল রসা রোডে, তারপর সেই পাগলা গারদ চলে আসে এখন হেস্টিংস এলাকায় যাকে আমরা চিনি পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসাবে। তবে পুরোনো নামে তো এখন ডাকা হয় না তাই নতুন ব্যবহার করতে হয় যেটা হলো টালিগঞ্জ! কিন্তু এই নাম টা কোথা থেকে এল? কলকাতা তথা ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসন চলছে, কলকাতার মধ্যে দিয়ে আদিগঙ্গা বইছে, তবে অনেক ছোট হয়েছিল এবং একটি বর্ডার হয়ে দাঁড়িয়েছিল গোবিন্দপুর খাঁড়ি। এই খাড়ির নাম হলো গোবিন্দপুরের খাঁড়ি ঐ খাঁড়ি টা সেই সময় এর বর্ডার। পরবর্তী কালে এই খাঁড়ি নাম পাল্টে গেল যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন সুরম্যান এই পাশে বসবাস করতে শুরু করলো তখন এই খাঁড়ির নাম হলো সুরম্যান ক্যানাল, তবে এই সূত্রে বলে রাখা ভালো যে 1715 সালে এই সুরম্যান ঔরঙ্গজেব নাতি ফারুকসিয়ারের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জন্যে ফরমান যোগার করেন যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যাবসার জন্য কোনো কর দেবে না। এখানেই কিন্তু শেষ হলো না, এবার আসলো ক্যাপ্টেন উইলিয়াম টলির পালা, এই টলি সাহেব ছিলেন মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার, তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কে বলেলন যে তিনি সুরম্যান নালা কাটতে চান,যার ফলে এই নালা টি গভীর হবে। যার ফলে মাল বহনকারী জাহাজ সোজা গড়িয়া পর্যন্ত চলে যেতে পারে, এর বদলে তিনি কোম্পানির কাছে চাইলেন যে সমস্ত জাহাজ এই পথ দিয়ে যাবে তাদের সমস্ত কর আদায় করবে টলি!


উইলিয়াম টলি


কোম্পানি রাজি হয়ে যায় এর ফলে সুরম্যান নালা হলো টলি ক্যানাল। এবার ঐ ক্যানাল কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাবসা বাণিজ্য শুরু হলো, টলি সাহেব ওখানে একটা বাজার বসালেন যার ফলে এই জায়গায়টির নাম হয়ে যায় টালিগঞ্জ। কিন্তু পাঠকরা ভাববেন এখানে টিপু সুলতান কী সম্পর্ক? বলছি একটু ধৈর্য ধরুন, এবার বলি এই টিপু সুলতান কিন্তু জীবনে কলকাতা তথা ক্যালকাটায় আসেনি নি এসেছিলেন তার বংশধররা। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার যে এখন বিভিন্ন দেশ মিসাইল ব্যবহার করে এই মিসাইল কিন্তু প্রথম ব্যবহার করে টিপু সুলতান, তার প্রতিপক্ষ ছিল ব্রিটিশরা। 1799 সালের ইঙ্গো মইসুর যুদ্ধ, এটি চতুর্থ ইঙ্গো মইসুর যুদ্ধ, এই যুদ্ধে মইসুর বাঘ টিপু সুলতানের মৃত্যু হয় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পুরো রাজ্য কে বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। 

ইঙ্গো মইসুর যুদ্ধ 


 টিপু সুলতান মৃত্যু ঘটে শ্রীরঙ্গপত্তনম অবরোধের সময়, সেই সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজ্যের পুরোটা দখল করে নিয়েছিল এবং শেষে হায়দারাবাদের নিজাম এবং মারাঠা শান্তি চুক্তি করেছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে। এই চুক্তি মাধ্যমে পুরো রাজ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হাতে তুলে দেওয়া বা বলা ভালো চলেগেছিল এবং রাজ্যের পুরো কর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কে তুলে দেওয়া হয় এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কে আরো টাকা দেওয়া হয়। এবং চুক্তির গ্যারান্টি অনুযায়ী টিপু সুলতানের দুই ছেলেকে প্রথমে কলকাতায় নির্বাসিত করা হয় এবং পরবর্তীতে আবার ফিরিয়ে আনা হয় অতিরিক্ত টাকা খরচের মাধ্যমে।

টিপু সুলতানের ছেলে গুলাম মহম্মদ শাহ্ 


 তবে টাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছিল নাকি টিপু সুলতানের ছিল সেই বিষয়ে জানতে পারিনি,ধরনা করা যেতে এই টাকা টিপু সুলতানের ছিল। এর পরবর্তী সময়ে 1806 সাল নাগাদ ভেলোরে হ্যাঁ ঠিক ভাবছেন এটা সেই ভেলোর যেখানে মানুষ চিকিৎসার জন্য যায়, সেই সময় ভেলোরে প্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈনদের মধ্যে ভেদাভেদ দেখা যায় কারণ তৎকালীন সময়ে সেনাবাহিনী ছিল ভারতীরা আর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিল ব্রিটিশরা। এই সময়টা ভারতীয় সেনাবাহিনী যে বিদ্রোহ দেখিয়ে ছিল, বলাই যায় এটা ছিল মহাবিদ্রোহের টিজার।

ভেলোর বিদ্রোহের স্তম্ভ 

 

এই সহিংস বিদ্রোহটি করা জুলাই মাসের দশ তারিখে, এই বিদ্রোহের কারণ ছিল নতুন পোশাকের আপত্তিকর ডিসাইন এবং পাগড়ির যায়গায় হেলমেট স্টাইল এর পাগড়ি এছাড়া উনির্ফমে কোনো বর্ণ চিহ্ন ছিল না। সেই সময় ভেলোর ফোর্ট ভারতীয় সেনাবাহিনী আটকে রেখেছিল, এমনকি সেই সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেনাবাহিনী কে খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা ও চালিয়ে ছিল। সেই দুর্গ এখনো ভেলোরে দেখতে পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশরা মনে করেছিল এর পিছনে নিশ্চয়ই টিপু সুলতানের পরিবারের হাত রয়েছে,যার ফল স্বরূপ তাদের আবার কলকাতার টালিগঞ্জের দক্ষিণ প্রান্তে জলাভূমিতে পাঠানো হয়। 'Exiles in Calcutta: The Descendants of Tipu Sultan,' এই লেখক উল্লেখ করেছেন যে টিপু সুলতানের পরিবারের 300 বেশি মানুষজন কলকাতার কুঁড়ে ঘরে রাখা হয় এবং তখন তাঁদের জীবন ছিল হয় দরীদ্রের মত। সেই সময় টিপু সুলতানের পরিবারকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। যদি ভেবে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গের এবং মইশুর পরিবেশ সম্পুর্ণ আলাদা এছাড়া রয়েছে তাদের জীবনযাত্রা। কিন্তু আস্তে আস্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং তারা ব্রিটিশ সরকার থেকে পেনসন পায় যারফলে কলকাতায় তারা বসতি স্থাপন করে। 1832 সাল নাগাদ টিপু সুলতানের ছেলে গুলাম মহম্মদ শাহ্ ধর্মতলা স্ট্রিট এবং চৌরঙ্গী মাঝখানে একটি জমি কেনেন যেখানে তৈরি হয় একটি মসজিদ যার নাম ছিল টিপু সুলতান শাহী মসজিদ, যা এখনো একটি ল্যান্ডমার্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

টিপু সুলতান মসজিদ 


 তিনি আরো একটি জমি কেনেন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে টালিগঞ্জ ক্লাব এবং রয়েল কলকাতা গল্ফ ক্লাব। এখানে আরও একটি ক্লাব রয়েছে সেটি হলো টালিগঞ্জ ক্লাব এটি প্রতিষ্ঠিত হয় 1895 সালে এটি অবশ্য একজন নীলকর সাহেব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে 1781 সালে নিয়েছিল নীলকর সাহেব রিচার্দ জনসন, ইনিইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশেষ এবং দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন। মনে করা হয় এটি ছিল প্রথম নীল চাষের জমি। পরবর্তী কালে এই 1880 নাগাদ জমি টি টিপু সুলতানের পরিবারের হাতে আসে এবং তার নাম হয় বুরহা বাগ। আর যে বাগান বাড়িটি ছিল সেটি মইসুর এস্টেটের অংশ হয়ে ওঠে অবশেষে টিপু সুলতানের ছেলে গুলাম মহম্মদ শাহ্ এর মৃত্যুর পর সেটি আর অবশিষ্ট থাকল না কারণ, পরিবার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর 1895 সালে একশো ত্রিশ একর জমি টি কিনলেন তৎকালীন বেঙ্গল ব্যাঙ্ক এর প্রধান স্যার উইলিয়াম ক্রুকশ্যা। তিনি সেখানে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে যা আজকের টালিগঞ্জ ক্লাব নামে পরিচিত।

টালিগঞ্জ ক্লাব 


 এরপর ব্রিটিশরা সহজেই টালিগঞ্জ ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে এবং ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে এর উপর তাদের প্রভাব বিস্তার করে। এতটাই যে, এই মাঠটিকে ' সাহিবানবাগিচা ' বা 'শ্বেতাঙ্গদের বাগান' বলা হত। জনসন এস্টেটের বাড়িটি আজও ক্লাবহাউস হিসেবে টিকে আছে। 1947 সালে দেশ ভাগের পর বহু মানুষের ভারতে চলে আসে, সেই সময় উদ্বাস্তুদের থাকার কোনো নিদৃষ্ট থাকার জায়গা ছিল না। অনেকেই এই ক্লাবের আশে পাশে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস শুরু করে এবং সেই সময় ক্লাবের আসে পাসে উদ্বাস্তু কলোনি গড়ে ওঠে এবং সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়। তবে এই ভাবে এখনো কলকাতার সঙ্গে টিপু সুলতানের নাম জড়িয়ে আছে আর তার সাথে রয়েছে মইসুরের গন্ধ।

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - https://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/why-legends-of-tipu-sultan-live-on-in-calcutta/articleshow/61530774.cms

https://www.getbengal.com/details/tipu-sultan-and-tollygunge-where-do-the-two-t-s-meet-getbengal-story

Comments