পুলু থেকে হলো পোলো


পোলো খেলা ( Polo )

আমাদের কলকাতায কিন্তু বিভিন্ন খেলা হয়, একদিকে যেমন ফুটবল তেমনি এবং আরো একটি খেলা সেটা পোলো। এই খেলা কিন্তু প্রধানত কলকাতায় শীত কালেই খেলা হয়। একটু শীতল ভাব এসেছে, কারণ ডিসেম্বর চলেই এসেছে এখন আমরা দেখবো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে পিকনিকে জড়হয়েছে মানুষ জন। আর অন্যদিকে চলছে পোলো খেলা। এই খেলা কিন্তু ভারতীয়দের মাধ্যমে দেখেছে ব্রিটিশ সরকার। তৎকালীন কলকাতার মানুষ তো এই খেলা কে চিনতে পারেনি, তাদের মনে নিশ্চয়ই এসেছে এটা আবার কী ধরনের খেলা, যেখানে ঘোড়ার পিঠে চড়ে একটা লম্বা হাতুড়ির মাধ্যমে বল কে মারতে হবে ! তবে এই খেলা ব্রিটিশদের খুব প্রিয় ছিল। তবে তার আগে এই পোলো খেলার ইতিহাস জেনে নেওয়া দরকার, এই পোলো খেলাটি পারস্যে খেলা হতো এবং ঐতিহাসিক রা মনে করেন ষষ্ঠ থেকে প্রথম শতাব্দী খেলা হতো। তখন ঘোড়ার পিঠে বসে লম্বা হাতুড়ি দিয়ে মাঠের মধ্যে বল নাচানো হতো। তখন কিন্তু মহিলা এবং পুরুষরা এই খেলাতে যোগ দিত। ষষ্ঠ শতাব্দীতে রাজা খোসরু দ্বিতীয় তার রাণীরা এবং তার সভাসদ নিয়ে এই খেলা করেছে বলে জানা যায়। এই খেলা পারস্য থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আরব, চীন, তিব্বত, জাপান এবং ভারতে এই খেলা আসে। তবে এই খেলার এই রকম নাম কেন সেই বিষয়ে ইন্ডিয়ান পোলো এসোসিয়েশন জানিয়েছে যে তিব্বতী শব্দ "পুলু" থেকে এই পোলো নামটি এসেছে যার অর্থ হলো "বল". ভারতে পোলো এসেছিল মোগল আমলে। সেই সময় এর নাম ছিল চৌগান। এই সুত্র ধরে আমরা জানতে পারি যে দিল্লির প্রথম সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবক পোলো খেলার সময়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যায় লাহোরে 1210 সালে। ইতিহাসের মত অনুযায়ী পোলো কাশ্মীর, লেহ এবং মণিপুরে ঐতিহ্যসালি রেকর্ড রেখেছে। তৎকালীন সময়ে অর্থাৎ তেত্রিশ সালে ( 33 AD ) রাজা নংদা লাইরেন পাখাংবাকে মণিপুরে পোলো একটি নতুন নাম দেয় "সাগোল কাংজেই". পোলো সঙ্গে ভারতেই পরিচয় হয় ব্রিটিশদের তাই কোনো ভাবেই বলা যাবে না পোলো খেলা ব্রিটিশরা এদেশে এনেছিল।

মণিপুরী পোলা খেলোয়াড় 


 ব্রিটিশ দেখে শীলচরে তখন আসাম মণিপুর বলে আলাদা রাজ্য ছিল না তখন এই সবই নর্থ ইস্ট অঞ্চলে। তখন শীলচর ছিল মণিপুর থেকে একশো নব্বই কিলোমিটার দূরে। স্বাধীন ভারতের প্রথম যুদ্ধ অর্থাৎ মহাবিদ্রহো শীলচর অঞ্চলে বিশেষ গুরুত্ব পায় নি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই অঞ্চলে তখন আলাদা রাষ্ট্র। তৎকালীন ব্রিটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ক্যাপ্টেন রর্বাট স্টুয়ার্ট এবং লেফটেন্যান্ট জে শেরার এই খেলাটি খেলতে দেখেছিলেন। এখানে রাজস্থান পোলো ক্লাবের যুগ্ম-সচিব বিক্রমাদিত্য সিং বরকানা বলেছেন 1862 সালে শীলচরে প্রথম ব্রিটিশ চা চাষি এবং ব্রিটিশ সরকার আধিকারিকরা শীলচরে একটি পোলো ক্লাব তৈরি করেন। খুব তাড়াতাড়ি পোলো খেলা তৎকালীন কলকাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন যায়গায় পরিচিতি লাভ করে এবং তৎকালীন ক্যালকাটায় 1864 সালে একটি পোলো খেলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, সেই সময় মণীপুরি খেলোয়াড়দের নিয়ে আসা হয়েছিল ব্রিটিশদের সঙ্গে পোলো খেলার জন্য। জানা গেছে ব্রিটিশরা খুব উতসাহিত হয়েছিল ভারতীয়দের খেলা দেখে সেই জন্য তারা মণিপুরি ঘোড়া কিনে নেয় ঐ ঘোড়া গুলি কে বলা হতো মেইতেই সাগোল। 1892 সালে তৎকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতা ইন্ডিয়ান পোলো এসোসিয়েশন ক্লাব খুলে গেছিল, 

ব্রিটিশদের তৈরি কলকাতার পোলা ক্লাব


সেই সময় এই খেলা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই সময়কার খবরের কাগজ পোলো কে জাতীয় খেলা বলে ছাপানো হয়েছিল বিখ্যাত ইংরেজি খবরের কাগজ গুলি তে। কিন্তু পোলো খেলার সময়ে ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন নিয়ম পাল্টেছিল প্রথম দিকে এই খেলায় দুটি দলে আটজন থাকতো পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকার আট থেকে চার করলো খেলোয়াড়দের সংখ্যা।এর কারণ ছিল ঘোড়াদের উচ্চতা, ভারতে এই খেলা অনেক আগের থেকেই খেলা হয় কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই খেলা কে বিশ্বব্যাপী করে তুলেছিল। এই কথা জানতে পারি যে ব্রিটিশ সরকার খেলাধুলা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই ফেলত, ভাইসরয় লর্ড কার্জন পোলো খেলা কে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই ঢুকিয়ে ছিলেন এবং জোর দিয়েছিলেন। এই ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয় কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে এই খেলা তাদের আশে পাশেই নেই, শুধুমাত্র ভারতীয় রাজপরিবার এবং সেনাবাহিনী যারা যোগদান করবে তাদের কাছেই এই আয়ত্বে এসেছিল। সেনাবাহিনী তে প্রথম ব্যারাকপুরে পোলো এখেলা চালু হয়।

 


সেই সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী অধিকাংশ ভারতে বসবাসকারী হিসাবে গন্য হয়। তবে এই খেলার ছিল লক্ষ্য ছিল শৃঙ্খলা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, মানসিক তৎপরতা, অশ্বারোহণ দক্ষতা এবং পুরুষত্বের আদর্শ গড়ে তোলা - যা ব্রিটিশত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এমনকি সামরিক অফিসারদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে এই খেলা ছিল অপরিহার্য। এই খেলার মধ্যেদিয়ে সেনা যাতে কোনোভাবেই মদপান না করতে পারে এবং একই সঙ্গে জুয়া না খেলতে পারে, সেই দিকে নজর রেখেছিল কারণ এই খেলা জন্য চারটে ঘোড়ার খেয়াল রাখতে হতো এমনকি ঘোড়ার জন্য যেসমস্ত আর্থিক খরচ হয়েছে বা হবে সেই দিকে সেনাদের নজর রেখেছিল। যার ফলে ঘোড়ার দের খেয়াল রাখা হবে তার ঘোড়া পিছনে এবং খেলার ক্ষেত্রে কতো খরচখরচা হচ্ছে সেই দিকে খেয়াল থাকবে এটাই ছিল সাহেবদের প্ল্যান। তৎকালীন রাজধানী কলকাতাতে দুই ব্রিটিশ সেনা অর্থাৎ জো শেরার এবং ক্যাপ্টেন রবার্ট স্টুয়ার্ট কলকাতায় একটি পোলো ক্লাব খুলেছিলেন 1862 সালে, এই ক্লাবের উদ্দেশ্য ছিল কলকাতার অভিজাতদের কাছে এই ক্লাব নিয়ে যাওয়া এবং তাদের পোলো খেলার সাথে যুক্ত করা এবং তাদের পোলো খেলার প্রতি আকৃষ্ট করা। কলকাতায় তার একটি মাঠ ও তৈরি করেছিল শুধু মাত্র পোলো খেলার জন্য, তবে যেই সব অভিজাতদের তারা ক্লাবে ঢুকিয়ে ছিল তাদের সবার কিন্তু উচ্চ মানের ঘোড়া ছিল। কলকাতার পোলো ক্লাব কিন্তু এক সত্যিকারের প্রেম কাহিনীর সাক্ষী, আগেই বলেছি পোলো খেলার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের ছিল না, সেই সময়ে জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই মান সিংহ পোলো খেলোয়াড় ছিলেন এবং তিনি কলকাতায় এসেছিলেন পোলো খেলার জন্য। 1931 সাল তখন পোলো খেলার মরুশম চলছে সেই জন্য একুশ বছর বয়সে পা দেওয়া মান সিংহ কলকাতার উডল্যন্স ছিলেন আর সেখানে তার লেখা হয় কোচবিহারের রাজকন্যা গায়েত্রী দেবীর সঙ্গে তার বয়স তখন বারো, কিন্তু এক দেখাতেই দুজনের মধ্যে ভালোবাসা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ছয় বছর পর দুজনের বিয়ে হয়ে যায়, সেই জন্য এই মাঠকে সবাই কামদেবের মাঠ বলে উল্লেখ করেন।

দ্বিতীয় সওয়াই মান সিংহ এবং গায়েত্রী দেবী

শুধু কী তাই সেই সময় কলকাতার অন্যতম অভিজাত ব্যাক্তি ইহুদী সম্প্রদায়ের নেতা স্যার ডেভিড জোসেফ এজরা কলকাতায় পোলো টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন এই ট্রফিটির নাম ছিল এজরা কাপ। এই কাপ ছিল সরকারি পোলো ট্রফি বলে দাবি করা হয়েছিল,আর এজরা সাহেব নিজস্ব মাঠ ছিল এবং পোলো খেলার জন্য সব সবুধা ছিল এখানে। কলকাতার আরো দুটি পোলো ট্রফি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে সেই দুটি হলো কারমাইকেল কাপ (1910) এবং স্টুয়ার্ট কাপ (1932). 



1857 সালের মহাবিদ্রোহের পর ভারতের ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে, রাণী ভিক্টোরিয়া বেন্টিঙ্ক, ম্যাকলে এবং ডালহৌসির স্বৈরাচারী নীতি গুলি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন, এবং তার পরিবর্তে ভারতীয় রাজপুত্রদের সাথে জোট বাঁধেন যাদের মাধ্যমে ব্রিটিশরা কার্যকরভাবে বিশাল জনসংখ্যাকে শাসন করতে পারে। ঐতিহাসিক ইতিহাসবিদ ফ্রান্সিস জি হাচিন্সের মতে, ডেভিড ক্যানাডাইনের অরনামেন্টালিজম: হাউ দ্য ব্রিটিশস স দেয়ার এম্পায়ার (২০০১) -এ উদ্ধৃত হয়েছে, "ভারত এমন এক সময়ে অভিজাত নিরাপত্তার সম্ভাবনার প্রস্তাব দিচ্ছিল যখন ইংল্যান্ড নিজেই গণতান্ত্রিক অশ্লীলতার শিকার হচ্ছিল।" কারণ বাংলার বিদ্রোহী মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী এবং জাতীয়তাবাদীদের নীতি এবং বিদ্রোহ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কে বাধ্য করেছিল ভারতীয় রাজপুত্র সাথে সম্পর্ক জোড়দার করার। তৎকালীন সময়ে কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ , মহীশূর, গোয়ালিয়র, পাতিয়ালা, যোধপুর এবং কোচবিহার সহ বেশ কয়েকটি রাজ্য আইপিএ-এর সাথে যুক্ত ছিল এবং বিভিন্ন টুর্নামেন্টে সাফল্য অর্জন করেছিল। পাতিয়ালার হীরা সিং, যোধপুরের হীরজি সিং এবং ধোকাল সিং-এর মতো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি এবং দলগুলি তাদের অশ্বারোহণের দক্ষতার জন্য প্রশংসিত হয়েছিল। যোধপুরের স্যার প্রতাপ সিং ১৮৮৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার জয়ন্তীতে তার রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, যেখানে তিনি যে অশ্বারোহণ ব্রীচ পরেছিলেন তা 'যোধপুর' নামে পরিচিতি লাভ করে, যা আজও ব্যবহৃত হয়। সেই সময় ব্রিটিশ সংবাদপত্রে ভারতে কোথায় পোলো খেলার আয়োজন হচ্ছে, কোনো সেখানে যোগ এবং কারা জিতছে সবকিছু ছাপা হতো। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কেউ যখন ইংল্যান্ডে ফিরে এসে পোলো খেলার আয়োজন করে, কিন্তু এটি ঔপনিবেশিক খেলা ছিল এবং ইংল্যান্ড পোলো খেলা বেশি তাৎপর্য পায়নি যেই সব দেশে ব্রিটিশ মেট্রোপলিটন অঞ্চল ছিল সোজাসুজি বলতে যে অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল সেখানে এই পোলো খেলা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, হংকং সহ বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই খেলা।

ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই পোলো খেলা সম্পূর্ন বন্ধ হয়ে যায় এমনকি ভারতের সেনাবাহিনী এই খেলা নিয়ে আর মাথা ঘামায় নি। পরবর্তীকালে পোলো খেলা সম্পূর্ন বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু দুইহাজার ছয় সালে নতুন করে পোলো খেলা আরম্ভ আর এই তখন থেকেই কর্পোরেট হাউসগুলি এই খেলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই খেলা কিন্তু এখনো কলকাতায় খেলা হয়!

ছবি সূত্র - Internet 

তথ্য সূত্র - https://indianexpress.com/article/research/polo-the-elite-sport-that-india-gave-to-its-imperial-rulers-9463360/

Kolkata has the world’s oldest polo club, and polo cup. Did you know? – GetBengal story https://www.getbengal.com/details/kolkata-has-the-worlds-oldest-polo-club-and-polo-cup-did-you-know-getbengal-story

https://share.google/1WiWAxzGFC6lXwMMv

Comments