ব্রিটিশরা বসালো ভারতীয় রাজার মূর্তি

মহারাজ লক্ষ্মীশ্বর সিংহ 

 

কলকাতার অনেক অংশে বিভিন্ন মূর্তিতে ঘেরা সেই ব্রিটিশ আমলের হোক কিংবা তার আগে রোমান আমলেরই হোক! বলা যেতেই পারে কলকাতা শহরে কে মূর্তির শহর বলা যেতেই পারে। মূর্তির শহর বলছি কারণ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের পলাশি যুদ্ধের পঞ্চাশ বছরের উল্লাসে বিভিন্ন পার্ক, গার্ডেন সহ বিভিন্ন মূর্তিতে কলকাতা কে সাজাতে উদত্য হয়। জানা গেছে কলকাতা প্রথম মার্বেল মূর্তি বসে 1803 সালে লর্ড কর্নয়ালিসের। 

লর্ড কর্ওনয়ালিস 

একই সঙ্গে বিভিন্ন ইন্দো ইউরোপীয়ান স্টাইলের বড় বড় বিল্ডিং তৈরি হয়েছিল। তার আগে অবশ্য গ্রীকদের তৈরি ঝর্না ছিলই, এছাড়া ব্রিটিশরা একটি ফাউন্টেন তৈরি করেছিল সেই কথা আগেই বলেছি একটি ব্লগে। 1920 সালে এই মূর্তিটি টাউন হল এবং পরবর্তীতে কালে এটি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল জায়গা পেয়েছে। সেই সময় কলকাতার চারিদিকে ব্রোঞ্জ এবং মার্বেল পাথরের বিভিন্ন মূর্তিতে ভরে গেছিল, তবে সবচেয়ে বেশি মূর্তি ছিল ব্রিটিশ রাজপরিবারে এবং সব গভর্নর জেনারেলের। 1881 সালে ঠাকুর পরিবারের একজন সদস্যের মূর্তি আনানো হয়েছিল লন্ডন থেকে, ইনি ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সত ভাই রামনাথ ঠাকুর। কিন্তু 1904 সালে ডালহৌসি স্কোরের কাছে এখনকার সময়ে দেখতে গেলে HSBC বিল্ডিং এর কাছে একটি মূর্তি বসিয়ে ছিল ব্রিটিশ সরকার তাও আবার একজন ভারতীয় মহারাজের। 1904 সালের 25 মার্চ তৎকালীন গভর্নর জেনারেল স্যার এন্ড্রু ফ্রেশার এবং ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি মহারাজ লক্ষ্মীশ্বর সিংহের মূর্তি উন্মোচন করেন। এই বার এই মহারাজ লক্ষ্মীশ্বর সিংহের ব্যাপারে আসা যাক, তিনি বিহারের দারভাঙ্গা অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকার তাকে মহারাজ উপাধি দিয়েছিলেন। তবে দারভাঙ্গা অঞ্চলের একটা কথা প্রচলিত আছে এটি ছিল দারভাঙ্গা নামটি দুটি স্থানীয় শব্দ - 'দার' (দ্বার) এবং 'ভাঙ্গা', যার অর্থ ভাঙা দরজা - যোগ করে তৈরি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন যে, 'কিউলা' (দুর্গ) কিলাঘাটে ছিল এবং ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ-বিন তুঘলকের কামান বা হাতির গুলিতে এর দরজা ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যখন তার বাহিনী শেষ স্বাধীন উত্তর ভারতীয় হিন্দু রাজাকে আক্রমণ করেছিল। বলা হয় ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী এবং ব্রিটিশরা ভারতীয় মহারাজের বিষয়ে খুব কৌতুহলী ছিল, এমনকি ডালহৌসি স্কোরের একটি মহারাজের মূর্তি বসানো তৎকালীন মহারাজ উপাধি ধারী জমিদার কাছে বিশাল বড়ো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। কিন্তু শুধু মাত্র এনার মূর্তি কেন বসানো হয়েছিল সেই বিষয়ে একটু রহস্য থেকেই যায়। 1858 সালে পঁচিশে সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীশ্বর জন্মগ্রহণ করেন বিহারের দারভাঙ্গার রাজকীয় পরিবার খান্ডাবালে। সেই সময় রীতিনীতি অনুযায়ী তিনি মৈথিলীর ব্রাক্ষণ পরিবারের পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করেন, কারণ অল্পবয়েসে তাকে জমিদারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। জানা গেছে তিনি দানপরায়ন জমিদার ছিলেন। তিনি তৎকালীন বিহারের উন্নতমানের রাস্তা বানিয়ে ছিলেন এমনকি তিনি রাস্তায় বিশ্রাম করার জন্য গাছ লাগিয়েছিলেন শুধুমাত্র তাই নয় তিনি নদীর উপর ব্রিজ বানিয়েছেন এমনকি তিনি 1873 থেকে 1874 সালে বিহারের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে তিনি লক্ষাধিক টাকা দান করেছিলেন। তিনি জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং তিনি দান করেছিলেন তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেসেকে। তিনি তৎকালীন বিহারের বিভিন্ন হাসপাতালের বন্দবস্ত করেন। এছাড়া তিনি আরো বিভিন্ন কাজ জড়িত ছিলেন, শুধু কী তাই কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাস তার নামে একটি বিল্ডিং রয়েছে। কিন্তু মহারাজ লক্ষ্মীশ্বর মাত্র 40 বছর বয়সে 1889 সালে মারা যায়। এই মূর্তিটি তৈরি হয়েছিল লন্ডনে এবং এটি তৈরী হয়েছিল মার্বেল পাথর দিয়ে এবং এর দায়িত্ব পড়েছিল এডওয়ার্ড অনস্লো ফোর্ডের, এটি ভরতে এডওয়ার্ড অনস্লো ফোর্ডের শেষ কাজ হিসেবে জানা যায়। মূর্তি টি দেখা যায় মহারাজ ডান হাতে তলোয়ার এবং বা হাতে ঢাল নিয়ে রয়েছেন মাথায় তার মণিমুক্ত বসানো পাগড়ি তার আবার জুতো রয়েছে এবং তিনি বসে আছেন বাবু হয়ে, এখানে এডওয়ার্ড অনস্লো ফোর্ড একটি ছবি ব্যবহার করেছিল মূর্তি তৈরির সময়।

সেই ছবি

 তবে ছবিটি ছিল একটি লিথিওগ্রাফ যেটি 1888 সালের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তিনি নাইটহুড উপাধি গ্রহণ কলেখেন সেই সময়ের ছবি। ঐ মূর্তি দেখে ভারতীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং বিখ্যাত কার্টুনিস্ট পিকেএস কুট্টি বলেছিলেন মূর্তিটি 40 বছর বয়সে মারা যাওয়া কোনও ব্যক্তির মতো দেখতে নয়, বরং একজন বৃদ্ধের মতো মনে হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে ভারতীয়রা মাটিতে পা রেখে বসে থাকলেও কখনও জুতা পরেন না।যেটি প্রকাশিত হয়েছিল টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। যাক সেই সব আগের কথা, কিন্তু এখন কলকাতার ইতিহাস কিংবা কলকাতার ঐতিহাসিক স্থান গুলো নিয়ে কথা বলেও এই মূর্তিটি গুরুত্বপূর্ণ পায়না। কিন্তু এখনও তিলোত্তমা কলকাতা মনে রেখেছে বসে থাকা মহারাজের মূর্তি কে!

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - Hidden gem | The statue of the Maharaja of Darbhanga, Bihar, Lakshmeshwar Singh Bahadur, at Kolkata’s Dalhousie Square - Telegraph India https://share.google/Tg6palm5shj3ble1Q

Comments