কলকাতার পোস্ট বাক্সের কথা

চিঠির বাক্স 

জিপিও কলকাতার অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। যার পুরো নাম জেনারেল পোস্ট অফিস। এখন যদি ধরে নেওয়া হয় যে ব্রিটিশরা আসার আগে পোস্ট হতো না, সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে মোগল আমলের বহু আগে থেকেই পোস্ট বা ডাক ব্যবস্থা ছিল। যদি অনেক ইতিহাস দেখা যায় তাহলে জানা যাবে পারস্যের বিরুদ্ধে গ্রিকদের জয়ের কথা ম্যারাথন দৌড়ে করে ৪৯০ কিলোমিটার রাস্তা করে অ্যাথেন্স যে পৌঁছে দিয়েছিল তাকে ডাকপিয়ন বলাই যায়। এমনকি আমাদের ভারতের ডাক ব্যবস্থার কথা জানা যায় মহম্মদ বিন তুঘলকের আমল থেকে মানে মোঘল সাম্রাজ্যের আগে থেকেই। 

মহম্মদ বিন তুঘলক

শুধু এখানেই শেষ নয় শেরশাহের আমলে এই ব্যাবস্থা ছিল, এই বিষয়ে আসছি একটু পরে‌। কারণ তার অগে ভারতের ডাক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইবন বতুতা কী বলেছেন সেটা জানানো দরকার। তার মতে ভারতে দুধরনের ডাক পিওন ছিল, যাদের কাছে ঘোড়া থাকত তাদের কে বলা হতো এল ওলাক এরা সাধারণত রাজা বা সম্রাটের সেনা বাহিনী কাজ করে এবং এদেরকে চার কিলোমিটার অন্তর রাখা হবে এর পর এক কিলোমিটার অন্তর একটি হাঁটা বা পদাতিক থাকবে যাদের ইবন বতুতা বলেছেন এল দাভা এদের কাজ হলো প্রতি তিন মাইল অন্তর থাকবে এবং এক এক জনের গ্রামে বার্তার বাক্স এবং বাহক থাকবে যাদের কাজ হবে যে জায়গায় ডাক পৌঁছানোর কথা সেখানে ডাক পৌঁছে দেবে। তবে ইবন বতুতা এই কথা বলেছেন প্রত্যেকের হাতে প্রায় দুই হাত লম্বা একটি চাবুক এবং এর মাথায় ছোট ছোট ঘণ্টা থাকবে। অতএব, যখনই কোনও বার্তাবাহক যে কোনও শহর ছেড়ে যায়, তখন সে তার বার্তাবাহক এক হাতে এবং চাবুকটি, যা সে ক্রমাগত কাঁপতে থাকে, অন্য হাতে নেয়। এইভাবে সে নিকটতম পদাতিক-দূতের দিকে এগিয়ে যায় এবং যখন সে কাছে আসে, তখন তার চাবুক নাড়ায়। এর পরে অন্য একজন আসে যে "সেই কারণেই সুলতান তার পাঠানো বার্তাগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পেয়ে যান।"এবার আসি মোগল আমলে তবে শেরশাহের আমলে, যেহেতু তিনি গ্রেন্ড ট্যাঙ্ক রোড তৈরি করে ছিলেন আর যার ফলে অনেক বাড়ি ঘর তৈরি হয় কারণ এই সড়ক টি সেই সময়ের সবচেয়ে উন্নত রাস্তা আর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ডাক পরিষেবা চালু ছিল এবং তার এই রাস্তাই ব্যবহার করতো। যদি উদাহরণ দিতে হয় তবে বলা যায় মহীশূরের একটি রাজত্ব যারা ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করে‌। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ছোট ছোট রাজ্য, এখানে প্রশ্ন জেগে উঠেতেই পারে সেই সময় ডাক ব্যবস্থার মধ্যে কী দেওয়া নেওয়া হতো! স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা গুপ্ত খবর বা চিঠি চালাচালি হতো না, তার যায়গায় হতো বিভিন্ন রাজ্যের মন্দিরের ভোগ, ফুল এবং ফল। সবচেয়ে বেশি জানা যায় উদয়পুর রাজ্যের কথা যারা প্রায় সব সময় পুস্কর মন্দিরে ভোগ পাঠাতেন। আমাদের ভারতের ডাক ব্যবস্থার উল্লেখ যোগ্য সময় হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতের ডাক ব্যবস্থা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন কলকাতা মাদ্রাজ ও বোম্বের ডাক ব্যবস্থাপনা হাত লাগায় রবার্ট ক্লাইভ।

 ইনি ভারতীয় ডাক ব্যবস্থা কে আরো মর্ডান করেছিলেন। জানা যায় তিনি তৎকালীন লোকল জমিদারের কাছ থেকে রানার ভাড়া করেন, তাদের কাজ ছিল ডাক পোঁছে দেওয়া, ঠিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ক্লাইভের পর এইসব কে কাঁধে নিয়ে নেওয়ার জন্য অন্য এক ব্রিটিশ অফিসার কে পাঠানো হয় তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যেমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে থাকা অঞ্চল গুলির ব্যক্তিগত ডাক পরিসেবা বন্ধ করে এবং পরবর্তীতে ইন্ডিয়ান পোস্ট সিস্টেম চালু করেন, একই সঙ্গে এই সব পোষ্ট অফিস কে সুদক্ষ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পোষ্ট মাস্টার জেনারেল পদ চালু করা হয়‌। এবং এখানে বলে রাখা দরকার যে, এখন যেরকম আমারা পোস্টম্যান দেখছি তখন ছিল রানার, শুরুটা অবশ্য ক্লাইভ সাহেব করেদিয়ে গেছিলেন। রানারদের বন জঙ্গল নদী পেরিয়ে চিঠি পৌঁছে দিতে হতো পরবর্তীতে যখন টাকা নিয়ে যেতে হতো রানাদের তখন আরো মুশকিল তাদের নিজেকে রক্ষার বল্লম থাকতো এবং থকাত হেরিক্যান আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে জানিয়েছে। ইংরেজ আমলের এই মেল-রানার বা ডাক-হরকরাদের কাজটা ছিল আরও কঠিন এবং বিপজ্জনক। বন্যায় নদীতে ভেসে যাওয়া, হিমালয়ের তুষারে তলিয়ে যাওয়া, ডাকাতের হাতে পড়া বা জঙ্গনে বাঘের পেটে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটত হামেশাই। এত বিপদ মাথায় নিয়েও চিঠির ব্যাগ রক্ষা করতে তাঁরা ছিলেন মরিয়া।

রানার 

 ঠিক সময়ে তাঁদের ডাক পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতা গ্রাম মিথে পরিণত হয়েছিল। মাসিক বারো টাকার মতো সামান্য বেতন পেয়েও তাঁদের সততায় ঘাটতি ছিল না। শুরু থেকেই ডাক ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন রানার বা ডাক-হরকরার। রেল-যোগাযোগ গড়ে ওঠার পর তাঁদের উপর নির্ভরতা খানিকটা কমলেও ডাক পরিবহণে তাঁদের প্রয়োজন ফুরোয়নি। উনিশ শতকের শেষেও সারা দেশে তাঁদের ছুটতে হত ৬৫,৪২৩ মাইল। রানারদের উপর এই ভরসার কারণ খানিকটা অর্থনৈতিক। ডাকবাহী জানে চিঠি বা পার্সেল পাঠানোর খরচ ছিল মাইলপ্রতি প্রায় বারো টাকা, সেখানে মাইলপ্রতি মাত্র এক টাকা নয় আনা খরচেই রনাররা এক পৌঁছে দিক গুটি কিলোগ্রাম ওজন পিঠে নিয়ে। তাঁদের কর্মনিষ্ঠানা যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেও রানার যায় ডাক হরকরারাই ছিলেন সে যুগে ডাক ব্যবস্থার প্রাণ। কোম্পানির খরচ বাঁচাতে প্রথম ডাক ব্যবস্থা চালু করেন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস। 

সবুজ রঙের পোস্ট বাক্স 

 তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকার সবুজ রঙের পোস্ট বাক্স বসিয়ে ছিল কিন্তু, এই জিনিসটা লক্ষ্য করে সবুজ রঙের পোস্ট বাক্স লোকের চোখে পড়ছে না, যার ফলে পোস্ট বাক্স রং লাল করা হয় এবং সেগুলো তাড়াতাড়ি চোখে পড়ে, প্রথম অবশ্য টিকিট লাগত না পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার মহারাণীর ছবির পোস্টার স্টাম্প তৈরি করে এবং সেগুলো হতো অন্য পদ্ধতিতে। কারণ ব্রিটিশ সরকারের লাভ হচ্ছিল এই ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে এমনকি এই সব কিছু শুরু হয়েছিল ওয়ারেন হেস্টিংস আমলে যখন তিনি তৎকালীন ভারতের নাগরিক জন্য এই ব্যবস্থা চালু করেন, কারণ তিনি বুঝেছিলেন এইক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের লাভ। ব্রিটিশ সরকার যখন পুরো মাত্রায় ভারত তথা কলকাতায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে, সেই সময় ডাক ব্যবস্থার বিস্তার করে যার ফলে ব্রিটিশ সরকার লাভ করে। এই সময় ব্রিটিশ সরকার ডিরেক্টর জেনারেল অফ দ্যা পোস্ট অফিস অফ ইন্ডিয়া 1885 সালে তৈরি করে, এই পদের প্রথম অধিকারী ছিলেন ফ্রেডিক রাসেল হগ‌‌। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন এই আমাদের যে হগ মার্কেট তৈরি করেন ইনি তার ভাই। কলকাতার মানুষ একটু অবাকই হবেন কারন দুই ভাই কলকাতার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।

ছবিতে রয়েছে ফ্রেডিক হগ

এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার শিমলা এ কিন্তু রাণী ভিক্টোরিয়া কে উদ্দেশ্য এক ধরনের পোস্ট বাক্স বানানো হয় এবং এর মাথার উপর মুকুট বসানো হয়।

সেই পোস্ট বাক্স 

দক্ষিণ ভারতের আরো একটি পোস্ট বাক্স চোখে পড়ে একে বলা হয় ত্রাভাঙ্কার রাজ্যে এই ব্যবস্থা চালু ছিল, এখান পোস্ট ম্যান বা রানারের মতো চিঠি বার্তা পৌঁছেদিত। এই রানারদের আলাদা ড্রেস ছিল এই ব্যবস্থা চালু ছিল কেরেলা অব্দি।

সেই বাক্স 

এই ডাক ব্যবস্থা বিভিন্ন কলকাতা তথা ভারতবর্ষে চালু ছিল এবং আছে ও থাকবে।

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - আনন্দবাজার পত্রিকা, wikipedia, time's of india, indian express, sansad tv


Comments