কলকাতার যেখানে সমাধিরা কথা বলে

সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি

 

কলকাতায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারতে তথা বাংলায় যাকিয়ে বসেছিল, কলকাতা তখন ছিল ব্রিটিশদের রাজধানী। শহর হওয়ার সাথে কলকাতায় সাদা চামড়ার মানুষ বাড়ছিল। আর তেমনই শহরে সাদা চামড়ার মানুষের মৃত্যু বেড়ে চলেছিল, এই রকম অবস্থায় শহরে একটি কবরস্থান দরকার, কিন্তু সেটা হবে কোথায়?। কিন্তু তখন একটি কবরস্থান ছিল, সেটা হলো এখনকার কাউন্সিল স্ট্রিটে যেখানে সেন্ট জন্স চার্চ অবস্থান করছে। কিন্তু কলকাতার প্রাকৃতিক পরিবেশ তো আর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকেদের জন্য সুখের ছিল না। কলকাতার গরম আর মশা ব্রিটিশদের কাল হয়ে উঠেছিল দুদিন, অন্তর কেউ না কেউ মারা যেত। সেই সময় কোনো রোগ সম্পর্কে ধারণা ছিল না, আর ছিল না কোন প্রাথমিক ওষুধ সম্পর্কে ধারণা, যা দিয়ে মৃত্যুকে আটকানো যায়। এতোটাই সাধারণ হয়ে উঠেছিল সেই সময় সাদা চামড়ার মানুষের মৃত্যু। এর ফলে জায়গায় ক্রমশই ছোট হয়ে যায় এবং শহরের ঠিক মাঝখানে কবরস্থান হওয়ার জন্য, অন্য সব বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতো। এই রকম অবস্থায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অফ গভর্নরস ঠিক করে, যে খুব তাড়াতাড়ি শহরের বসবাসের যায়গা থেকে দূরে একটা কবরস্থান তৈরি করা দরকার। 1767 সালে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট বোর্ড কে জানায় যে নতুন কবরের স্থান তৈরি, এই কবরের স্থানটি হলো মিস্টার ভ্যানিসটারসের বাড়ি কাছে, যদি এখনকার সময় হতো তাহলে near by এইরকম কিছু দিতে হতো। সে যাই হোক কিন্তু অবস্থা এইরকম পর্যায়ে পৌঁছেছিল সেই দিন আগস্ট মাসে মিস্টার উড নামক একজন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাইটার বা কেরানি পরলোকগমন করেন এবং ঐ কবরস্থানে ঐ ব্যক্তিকে প্রথম কবর দেওয়া হয়েছিল, তাহলে কতটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ছিল কলকাতার সাহেবদের পক্ষে বুঝতেই পারছেন। এইরকম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ঠিক করলো শহরের কোলাহল থেকে দূরে একটি কবরস্থান করা হবে, সেই অনুযায়ী এখন পার্ক স্ট্রিট তখন ছিল, বুরিয়াল গ্রাউন্ড রোড নামে পরিচিত। 

এই আঠ একড় জমি জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন পুরুষ মহিলা শিশু সহ এক হাজার ছয়শো জনের সমাধি। এই সমাধি গুলি মধ্যে অন্যতম হলো হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডি রোজারিওর সমাধি।

ডি রোজারিও 

 1767 থেকে 1830 অব্দি চালু ছিল এই কবরস্থান, অবশ্য সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রির ঢোকার গেটে লেখা আছে 1790 সালে এখানে কবরস্থান বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু 1840 অব্দি এই কবরস্থান বা গোরস্থান চালু কারণ ভেতরে পাথরের ফলক গুলো দেখলেই বোঝাই যায়। 

ঢোকার গেট

আর গোরস্থান কেন, কারণ এখানে গোরা অর্থাৎ ব্রিটিশ দের কবর দেওয়া হতো, বলাই সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি হলো এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম কবরের স্থান গুলির মধ্যে একটি। সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি অন্যতম চার্চ হীন কবরস্থান। এই কবরের স্থানটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রেভারেন্ড উইলিয়াম প্যারি আঠেরো শতকের শেষের দিকে এই গোরস্থানের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তাকে তার মাসিক মাইনের সাথে অতিরিক্ত ত্রিশ টাকা দেওয়া হতো, এর সাথে তাকে পালিকি দেওয়া হয়েছিল এবং পাবলিক বাহক নিযুক্ত করা হয়। এছাড়া সেই পালকি বাহকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যাবস্থা করা হয় যাতে তারে নতুন কবরের স্থানে যেতে শহরের মধ্যে দিয়ে কারণ গোরস্থান ছিল শহরে বাইরে সেই রাস্তার নাম আগেই বলেছি। বলা হয় এখানে নাকি 1,600 বেশি সমাধি রয়েছে, তার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সমাধি রয়েছে যেমন ডি রোজারিও ইয়ং বেঙ্গল এর প্রতিষ্ঠাতা এবং হিন্দু কলেজ মানে এখনকার প্রেসিডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। বাংলার নবজাগরণের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। তাছাড়া এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সমাধি রয়েছে, তিনি হলেন স্যার উইলিয়াম জোন্সের সমাধি, যিনি এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা।

Sir William Jones এর সমাধি

 এখানে রয়েছে এক প্রেমিকার সমাধি যার উপর লেখা আছে তার প্রেমিকের কবিতা, সেই হতভাগ্য প্রেমিকার নাম ছিল রোজ্ এলমা আর সেই প্রেমিকের নাম ওয়াল্টার স্যাভেজ ল্যান্ডর আর সেই সমাধির উপরে লেখা আছে


সেই সমাধি 


সেই কবিতা 


কাছ থেকে ছবি


" Rose Aylmer, whom these wakeful eyes

May weep but never see

A night of memories and sighs

I consecrate to thee” 


আবার এই সমাধি গুলোর মধ্যে মধ্যে রয়েছে জর্জ বোগলের, যিনি একসময় বাংলার প্রথম গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। 1774 সালের গ্রীষ্মে হেস্টিংস বোগলকে পাঞ্চেন লামার সাথে যোগাযোগ করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন, এই আশায় যে তিব্বত এবং চীনের সাথে বাণিজ্য সংযোগ চালু করা যেতে পারে। প্রচেষ্টা সফল প্রমাণিত হওয়ায়, বোগল তিব্বতে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রদূত হন। তিনি বাংলার সমভূমিতে প্রথম তিব্বতি বৌদ্ধ বিহার, ভোটবাগান মঠ নির্মাণের প্রেরণাও ছিলেন , যা আজও হাওড়ার ঘুসুরিতে টিকে আছে।

জন গার্স্টিন

এখানে রয়েছে গাস্টিনের সমাধি হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন যার নামে কলকাতার একটি রাস্তা এবং যায়গা রয়েছে, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রধান প্রকৌশলী মেজর-জেনারেল জন গারস্টিন। গার্স্টিন কলকাতার টাউন হলের পাশাপাশি পাটনার গোল ঘরের ইঞ্জিনিয়ার ও ডিজাইনার ছিলেন ছিলেন। 1792 সালে যখন কলকাতার ওল্ড কোর্ট হাউসটি ভেঙ্গে ফেলা হয়, তখন গার্স্টিন ভবনটির ইট ব্যবহার করে একটি কুল-ডি-স্যাকে পাঁচটি ভবন নির্মাণ করেন যা বর্তমানে গার্স্টিন প্লেস নামে পরিচিত। এখান থেকে, ভারতীয় সম্প্রচার সংস্থা, অল ইন্ডিয়া রেডিওর পূর্বসূরি, 1927 সালে তার কার্যক্রম শুরু করে। এই কবরস্থানের সমাধি গুলি স্থাপত্য শিল্পের দিকথেকে আলাদা, কলকাতার আরো অনেক কবরস্থান রয়েছে যেখানে সমাধিরা আমাদের কলকাতার ইতিহাস বলে চলেছে......

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - http://aakarpatna.blogspot.com/2017/08/the-south-park-street-cemetery-kolkata.html

https://www.shadowsgalore.com/2014/01/south-park-street-cemetery-kolkata/


Comments