কলকাতার এক ঘাটে নাম সুরিনাম ঘাট!

সুরিনাম ঘাটে ভাই বাপ স্ট্যাচু 


 

কলকাতাকে ঘিরে রেখেছে বিশাল নদী গঙ্গা, অনেক হুগলি নদী বলতে পারে। যেহেতু কলকাতা কে ঘিরে রেখেছে নদী তাই এখানে ঘাটের সংখ্যাও কম নয়। এই নদীর জন্যেই তো ব্রিটিশ, আর্মেনিয়া, পর্তুগিজ, ডাচ, এবং আমেরিকানরাও এসেছিল। এই নদীর জন্যেই কিন্তু কলকাতা বিরিয়ানি এত রমরমা, ভাবছেন তো বিরিয়ানি সাথে আবার নদীর কী সম্পর্ক? ব্রিটিশরা যদি ওয়াজেদ আলী সাহ কে কলকাতায় না পাঠাতো, তাহলে তো আর কলকাতা বিরিয়ানি হতো না।

ওয়াজেদ আলী সাহ 


 কারণ কলকাতায় তো নবাব আসলো নদী পথেই। তাই সেই রকম একটা ঘাটের কথা বলবো। 1860 সাল নাগাদ দাশ প্রথা শেষ হতে চলেছে। এখানে বলে রাখা দরকার ভারতে কিন্তু দাশ প্রথা কিন্তু ভারতে চালু ছিল। এইরকম সময়ে ডাচ সরকার ব্রিটিশ ভারতের কাছে কাছে কয়েকজন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক চেয়েছিলেন সেই জন্য তারা নেন্দারল্যান্ড এর হেগ শহরে ব্রিটিশ সরকার সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন এই শ্রমিক জন্য। বোঝাই যাচ্ছে ব্রিটিশ এই বিষয়ে কোনো আপত্তি করেনি। 1870 সালে সেপ্টেম্বর মাসেের আট তারিখে এই চুক্তি কার্যকর করা হয়, ধরে নেওয়া যায় যে তখন সুরিনাম অঞ্চলটি ডাচদের উপনিবেশ ছিল, যা কিনা এখন দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে অবস্থিত। কিন্তু তৎকালীন ডাচ সরকার ব্রিটিশ ভারতের কাছে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক কেন চেয়েছিল ? এর উত্তর হিসেবে জানা যায় সুরিনামে আঁখ এবং কলা চাষে জন্য শ্রমিক চেয়েছিল তৎকালীন ডাচ সরকার। 1872 সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 17 তারিখে ব্রিটিশ ও ডাচ সরকারের মধ্যে পুরোপুরি চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং তার পরের বছর মানে 1873 সালের 26 ফেব্রুয়ারি লালা রুখ জাহাজ এসে থামে মেটিয়াবুরুজের ঘাটে।

মেটিয়াবুরুজ ঘাট 

 এই জাহাজ মোট 410 জন যাত্রী উঠেছিল তার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বাসিন্দা এছাড়া ও বাঙালি ও ছিল। এই 410 জন কে নিয়ে জাহাজ রওনা দেয় সুরিনামের উদ্দেশ্যে, তিন মাস পর জুন মাসের 5 তারিখে সুরিনামের রাজধানী পারমারিবোতে, যখন জাহাজ পৌঁছায় তখন দেখা যায় 410 জনের মধ্যে 399 জন তখন জীবিত আর বাকিরা মৃত। এই জাহাজে যারা রওনা দিয়েছিল তাদের মধ্যে 279 জন পুরুষ 70 জন মহিলা ছিল আর কমবয়সী দের মধ্যে ছেলেদের সংখ্যা ছিল 32 আর মেয়েদের সংখ্যা ছিল 18 উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এদের বয়স ছিল 10 বছরের কম। 1873 থেকে 1916 সাল পর্যন্ত 64 টি জাহাজ সুরিনামে যাওয়া - আসা করেছিল, তাই হিসাবে করলে জানা যায় মোট 34 হাজার 304 জন শ্রমিক সুরিনামে নিজের বাড়ি বানিয়েছিল। এমনকি সেই সময় সুরিনামে এই শ্রমিক দের সাথে তাদের মালিকদের সাথে কাজের সময় নিয়ে ঝামেলা হতো। কিন্তু এই সবকিছু উর্দ্ধে সুরিনামে সমাজে ভারতীয় শ্রমিকরা নিজের একটা যায়গা করে নিয়েছিল। জানা গেছে সুরিনাম ভারতীয়দের নিজেদের উৎসব পালন করতো, বিশেষ করে দীপাবলি এবং ইদ। সেই সময় মানে ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে থেকে আঁখ চাষের জন্য শ্রমিকদের অন্যান্য দেশে পাঠাতো ব্রিটিশ সরকার, জানা যায় এক মিলিয়নেরও বেশি ভারতীয় ক্যারিবিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মরিশাস এবং ফিজি দ্বীপপুঞ্জে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসাবে স্থানান্তরিত হয়েছিল। মরিশাস, গুয়ানা কিংবা সুরিনামে শ্রমিক পাঠানোর তৎকালীন কলকাতায় পালতোলা নৌকা জাহাজ গুলি এসেছে দাঁড়াতো, কলকাতা ছিল তাদের ডিপো এবং এখান থেকেই সব জাহাজ রওনা হতো।

এছাড়াও ছোট ছোট নৌকা থাকতো ঘাট গুলি তে, যারা শ্রমিক দের জাহাজে পৌঁছে দিতে। অপেক্ষারত জাহাজের জেটি গুলি কে তাদের গন্তব্য স্থল কোথায় এবং কোন শ্রমিকদের দল কোথায় নামবে সেই সব জানিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু গন্তব্য স্থলে পৌঁছানোর পর জেটি গুলি ফিরে আসলে তাদের কোথায় নামানো হয়েছে সেই সব কাগজপত্র তার হারিয়ে ফেলতো, একমাত্র সুরিনামের কাগজপত্র এখনো অক্ষত রয়েছে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতেও এখনকার মতো দালাল চক্র কার্যকর ছিল, এই সব দালালরা উত্তর প্রদেশ, বিহার,মুজ্জাফরপুর এবং বেনারস ও এলাহাবাদ থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করতো এই দালালদের একটি মুখভরা নাম ছিল সাব এজেন্ট এরা প্রতিটি পুরুষের জন্য পঁচিশ টাকা নিত আর মহিলাদের জন্য পঁয়ত্রিশ টাকা নিত।

শ্রমিকরা সুরিনামে যাওয়ার সময় 




এই সব শ্রমিকদের ট্রেনের মাধ্যমে কলকাতা নিয়ে আসা হত এবং কলকাতায় আসার পর তাদের কে একটা থালা, এক জোড়া পাঞ্জাবি বা শাড়ি, এবং ধুতির সঙ্গে ছোট্ট কলসি দেওয়া হতো। সুরিনামে গিয়ে যখন তারা বুঝেছিল যে তারা শ্রমিক হিসেবে নয় বরং দাস হিসেবে এই নতুন দেশে এসেছে, তখন আর তাদের ফেরার উপায় নেই সেই জন্য আগেই বলেছি সুরিনামের সমাজে তারা আলাদা যায়গা করে নিয়েছিল। ভারতের সাথে সুরিনাম এর সম্পর্কে প্রায় 150 বছরের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর 2015 সালে গার্ডেন রিচের মেটিয়াব্রুজ অঞ্চলে হুগলি নদীর বালু ঘাটে অক্টোবর মাসের 7 তারিখে এই মূর্তিটি উন্মোচন করা হয়। এই মূর্তিটি মাই বাপ মূর্তি নামে বিখ্যাত, এই দুটি মূর্তি এলুমিনিয়ামের তৈরি। একজন মহিলা এবং একজন পুরুষ হাঁটছে তাদের হাতে একটি পুটলি।



এই মূর্তিটির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে ভালো ভবিষ্যৎ জন্য নিজের দেশ ঘর ও প্রিয়জনদের ছেড়ে বিদেশে পারি দিচ্ছে। এই মূর্তিটি নিচের ফলকে ডাচ, ভোজপুরি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা হয়েছে সেই সময়ের শ্রমিক দের কষ্ট ও সংগ্রামের ইতিহাস।
সুরিনাম ঘাটে সেই ফলক

কিন্তু জানলে অবাক হতে হয় বালু ঘাটের এই মাই বাপ মূর্তি আসলে রেপ্লিকা। সুরিনামের রাজধানী পারামারিবো এর ক্লেয়ানির ওয়াল্টার স্ট্রিটে 1994 সালে ভারত থেকে আগত শ্রমিক দের স্মরণে তৈরি করা হয়েছে।
আসল স্ট্যাচু যার রেপ্লিকা বালু ঘাটে রয়েছে 



 সত্যি অবাক লাগে যখন বিদেশিদের কাছে শিখতে হয় নিজের জনজাতি কীভাবে সম্মান করতে হয়। মাই বাপ মূর্তি উন্মোচনের দিন সুরিনামের রাষ্ট্রদূত আশনা কানহাইয়ের ( Aashna Kanha ) আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি বলেন “Today, there are 170,000 people of Indian origin in Suriname (the total population is 558,368). There are also 200,000 of them in Holland who decided to leave Suriname when the country became independent 42 years ago,” said Kanhai as she folded her palms in a namaskaar in front of the Mai Baap Memorial. তবে শ্রমিকরা এখন আছে যারা বিদেশে যায়না ঠিকই কিন্তু ভারতের বেশিরভাগই রাজ্যেই বিভিন্ন যায়গায় থেকে এরা ভালো ভবিষ্যৎ জন্য কাজ করে চলেছে, এদের এখন বলা হয় পরীজায়ি শ্রমিক। সুরিনাম ঘাট ভারতীয় ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হিসাবে কাজ করে, যা সুরিনামে এবং ক্যারিবিয়ান এবং প্রশান্ত মহাসাগরের অন্যান্য দেশে ভারতীয় প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত, কিন্তু ভারতের মধ্যে এটি তেমন পরিচিত নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে গেলে বলা যায়

 ওরা কাজ করে

 দেশে দেশান্তরে,

 অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের সমুদ্র-নদীর ঘাটে ঘাটে, 

পঞ্জাবে বোম্বাই-গুজরাটে।

তবে কলকাতা এখনো মনে রেখেছে ।

ছবি সূত্র - internet 

তথ্য সূত্র - https://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/leisure-hub-at-old-port-workshop/amp_articleshow/73818186.cms

https://www.thehindu.com/news/national/other-states/finally-a-memorial-for-indentured-labours-at-kolkata-ghat/article20928693.ece

https://indianexpress.com/article/cities/kolkata/in-honour-of-labourers-who-left-for-suriname-a-memorial-to-baba-mai/

Comments