শতাব্দী পুরনো ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স বিল্ডিং

ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির অফিস বতর্মানে LIC মালিকাধীন 

 

আমাদের কলকাতা শহরে প্রাচীন বাড়ির কিন্তু অভাব নেই। অভাব হবেই কেন, ভারতের প্রথম রাজধানী ছিল তো আমাদের কলকাতা। 1911 সালে কলকাতা থেকে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লিতে। আর সুবাদে আমাদের কলকাতায় অনেক প্রাচীন বিল্ডিং রয়েছে। আজকে সেই রকম একটি বিল্ডিংএর কথা বলবো। এই বিল্ডিং এর নাম হলো ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স বিল্ডিং। এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি দাড়িয়ে আছে ক্লাইভ রো এর উপর, এখন অবশ্য এই রাস্তাটির নাম হয়েছে ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ সরনি। বলা হয় যে প্রথম দিকে ব্রিটিশরা যখন ভারত শাসন করছে তখন বীমা কোম্পানি গুলি উপনিবেশ গুলি তে নিজের বীমা কোম্পানি খুলতে নারাজ ছিল। কারণ সেই সময় ইউরোপীয়দের মৃত্যু হার অনেক বেশি ছিল, হবেই না কেন বলুন তো! তারা তো ভারতের আবহাওয়া সঙ্গে পরিচিত ছিল না। কিন্তু 1846 সালে স্ট্যানর্ড লাইফ অ্যাসুরেন্স কোম্পানি ও কলোনিয়াল লাইফ অ্যাসুরেন্স কোম্পানি একসাথে হয়। স্ট্যানর্ন্ড লাইফ অ্যাসুরেন্স কোম্পানির অফিস ছিল কলকাতায় আর সেখানে থেকেই তাদের বীমা কোম্পানির ব্যাবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে এবং তার ফল স্বরূপ 1896 সালের মে মাসে কলকাতায় তাঁদের বীমা কোম্পানির বিল্ডিং স্থাপন হয়। এরপর 1914 সালে ওরিএন্টাল বীমা কোম্পানি কলকাতায় তাঁদের বীমা কোম্পানি শাখা খোলে। এই বীমা কোম্পানির প্রধান শাখা ছিল তৎকালীন বোম্বাই তে অর্থাৎ এখনকার মুম্বাই তে। আর এই বীমা কোম্পানি 1874 সালের মে মাসের পাঁচ তারিখে তাদের পথ চলা শুরু করে বোম্বাই তে, তারা তাদের বীমা কোম্পানির দ্বিতীয় শাখা খোলে 1901 সালে মাদ্রাজ বর্তমানের চেন্নাই তে আর তৃতীয় শাখা ছিল কলকাতায়। এই বীমা কোম্পানি একটি রীতি ভেঙ্গে দিয়েছিল, সেই সময় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এবং ইউরোপীয় বীমা কোম্পানির কাছে স্থানীয়দের মানে নেটিভদের মৃত্যুর কোনো পরিসংখ্যান ছিল না। তাই সেই সময় ইউরোপীয় বীমা কোম্পানি গুলি শুধু মাত্র ইউরোপীয়দের জীবন বীমা করতো। এবার বলি কোন রীতি ভেঙ্গে দিয়েছিল এই ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স কোম্পানি। এই কোম্পানি শুধু মাত্র ইউরোপীয়দের বীমা করেনি তার সাথে ভারতীয়দের বীমা করেছিল। শুধু তাই নয় ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির পরিচালক মানে ডিরক্টর পদে ছিলেন কামরুদিন তৈয়বজি, রঘুনাথ নারায়ণ খোটে, জাহাঙ্গীর রুস্তমজী মোদি এবং অন্যান্য 9 জন ধনী ভারতীয়। এই বীমা কোম্পানি শুরু করেছিলেন মিঃ ডানকান ম্যাকলাউচলান স্লেটার। বলা হয়ে থাকে এই রীতি ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য তাদের প্রভুত লাভ হয়। 1874 সালের নভেম্বর মাসে তাদের পলিসি বইতে দেখা যায় সাতেরোটি পলেসি রয়েছে আর 54,000টাকা বার্ষিক আয় হয় এবং তাঁর সাথে 2,812 আয় হয়, যার ফলে আরো কয়েক দশক তাদের ব্যাবসা ভালো হয়। ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির বিল্ডিংটি মোটামুটি ভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত, আর এই ভবনের রাস্তা তুলনামুলক সরু। এই বিল্ডিংটির অনেকগুলি প্রবেশ পথ রয়েছে। বিল্ডিংটির উত্তর পূর্ব দিকে রয়েছে উইল হাউস রাস্তার ওপারে রয়েছে জেসোপ কোম্পানির বিশাল ভবন। 

জেসোপ কোম্পানি ভবন ( Jessop Building )
 


এই ভবনটির সামানের অংশটি 9 বে চওড়া ( এখানে বলে রাখা দরকার যে পুরোনো দিনের ভবন গুলির আকৃতির বিবরন দেওয়া সময় এই এই "বে" bayes কথটি ব্যবহার হয়। আমার ব্যাক্তিগত ধারনা এই bayes গুলি হলো কার্নিস ) আর প্রধান বে দ্বিতীয় তলায় পেডিমেন্ট রয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির চিহ্ন জ্বলন্ত সূর্যের মাঝখানে একটি উল্টো তারা যার আবার পাঁচটি বিন্দু রয়েছে এবং সূর্যের চারপাশে সাপের মতো ফুলের নকশা রয়েছে। 

সেই চিহ্ন 

বলা হয়েছে যে এই ভবনটির বাইরের দিকে অনেক জটিল নকশা ব্যবহার করা হয়েছে, এবং আরো বলা হয়েছে এই বিল্ডিংসহ আরো অনেক বিল্ডিং বা ভবনে স্টুকো ব্যবহার কার হয়েছে। ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স বিল্ডিং আরো একটু আলাদা করা হয়েছে কারণ এই ভবনে স্টুকো সজ্জার নিছক স্কেল এবং পরিমান। এই বিল্ডিং টি চারতলা ছিল কিন্তু এখন পাঁচ তালা হয়েছে। এই বিল্ডিং চার পাশে আয়নিক ক্যাপাটাল সহ চারটি সম্ভের নকশা করা হয়েছে। বিল্ডিং দোতলায় যেইটা আসলে প্রধান অফিস তার ঠিক জানালার উপরে একটি মানুষের মুখের অলংকরণ রয়েছে। যাকে ফেস্টুন বলা হয় আর এখানেও সেই স্টুকো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। আর মুখের অলংকরণ সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ফুল, ফল এবং রিবন দিয়ে ফেস্টুন দিয়ে সাজানো। খুব একটা মানুষের চোখে পড়েনা এই মুখের অলংকরণ টি। 

সেই মুখের অলংকরণ 


এই বিল্ডিংটির bayes গুলি কে চারটি কলামে বিভক্ত করা হয়েছে মানে একতালা দোতলা তিন তালা আর চারতালায়। আর প্রতি তালায় গ্রীক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে, আর প্রতিটি গ্রীক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে হাতে উপরে তুলে। মনে হচ্ছে তারা এই বাড়িটির ভার বহন করছে। এক একটা ফ্লোরের সমান উচ্চতার এই গ্রীক পুরুষ গুলি। 

গ্রিক পুরুষের মূর্তি 


বর্তমানে এগুলি আগাছা ও গাছপালায় ভর্তি বোঝাই যায় না যে এগুলি কত ঐতিহ্য বহন করছে। আরো একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলায় প্রতিটি জানালার উপরে মানুষের মুখের অলংকরণ রয়েছে এবং একইভাবে সেগুলো ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। সবকটি মুখের অলংকরণ কিন্তু আলাদা এর কী সেই জানিনা। জানা যায় যে বিল্ডিং ছোট্ট একটি অংশ ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স মালিকাধীন আর বাকি সব ভাড়া দেওয়া অফিস।   

শোনা যায় ব্যাঙ্গালো, নাগপুর এবং রেঙ্গুনে ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির শাখা খুলেছিল। এখনও নাকি রেঙ্গুনে ওরিয়েন্টাল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির অফিস টিকে রয়েছে এবং দেখাও যায়। 1914 সালে স্থাপিত এই বাড়িটি কলকাতার পুরোনো ভিন্টেজ বাড়িগুলির মধ্যে অন্যতম এবং ডালহৌসি সেরা ভবন গুলির মধ্যে অনন্য। কিন্তু বর্তমানে এই বিল্ডিংটি LIC অর্থাৎ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার মালিকানাধীন। তারা একশো বছর পুরনো এই বাড়িটি রক্ষনাবেক্ষণ করে না এমনকি বিল্ডিং কিছু অংশ ভেঙে গেছে বর্তমানে LIC তরফ থেকে বোর্ড টাঙানো হয়েছে এই বিল্ডিং টি বিপদজনক। পরবর্তী কালে হয়তো এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলে তার জায়গায় নতুন বিল্ডিং তৈরি হবে, কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী বিল্ডিংটির কথা মনে রাখবে কলকাতা। সবশেষে একটা প্রশ্ন দ্বিতীয় তলায় জ্বলন্ত সূর্যের মাঝখানে তারাটি উল্টো কেন? আর সব জায়গায় তারাটি সোজা।

সোজা তারা 


ছবি সূত্র - internet

তথ্য - http://double-dolphin.blogspot.com/2014/07/the-oriental-assurance-building-clive.html



Comments