যেই ঘাট বাঁচিয়েছিলো নারীদের সম্মান !

রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা জেনানা ঘাট 

কলকাতার মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে অন্যতম নদী গঙ্গা। উত্তরাখণ্ডের পশ্চিম হিমালয় পর্বতশ্রেণীর গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে গঙ্গা নদীর উৎপত্তি হয়েছে। গঙ্গোত্রী হিমবাহ তিব্বতের সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চলে ভারতের উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলায় অবস্থিত। এই হিমবাহটি হল গঙ্গার প্রাথমিক উৎসএবং হিমালয়ের বৃহত্তম হিমবাহগুলির মধ্যে একটি, যার আনুমানিক আয়তন 27 ঘনকিলোমিটারেরও বেশি। গঙ্গা নদী ভারতের জাতীয় নদী। 
দেখা যায় গঙ্গা নদীর একদিকে আজ আছে হাওড়া, আর অন্যদিকে কলকাতা। ঠিক মাঝখানে দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা নদী। গঙ্গা নদী বুকে অনেক ছোট বড় ঘাট রয়েছে, সেই ঘাটে জাহাজ কে নোঙর করে ব্রিটিশরা কলকাতা ব্যবসা করতে এসেছিল, আর কবির ভাষায় "বণিকের মান দন্ড দেখা দিল রাজ দন্ড রুপে" । গঙ্গার অনেক ঘাট পালোয়ানদের আখড়া ছিল, অনেক ঘাটে পালোয়ানরা মুগুড় ভাজতো এবং কুস্তি করতো, এমনকি রেসলিং রিং ছিলো। 
গঙ্গা ঘাটে তো শুধু মাত্র জাহাজ আসতো না মানুষ গঙ্গায় স্নান করতো, মূলত স্নানের জন্য গঙ্গার বুকে অনেক ঘাট বানানো হয়েছিল। 
আজকে সেইরকম একটা ঘাটের কথা বলবো। এই ঘাটটির নাম হলো রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা জেনানা ঘাট। যদি ঘাটটি অবস্থানের কথা বলতে হয় তাহলে বলতে হয় হুগলি নদীর তীরে, রবীন্দ্রসেতু নিচে এই ঘাটটি অবস্থান করছে।
RAM  CHANDRA  GOENKA ZENANA BATHING GHAT



 এই ঘাটটি ছিলো মহিলাদের ঘাট, কেন এই বলছি নিশ্চিয় প্রশ্ন আসতেই পারে, আমার এসেছিল। আসলে সেই সময় তো বাড়িতে bathroom ছিল না, তাই স্নান করতে হতো পুকুর কিংবা গঙ্গার ঘাটে। আর মহিলাদের গঙ্গার ঘাটে স্নানে জন্য আলাদা কোনো ব্যাবস্থা ছিল না। এখন যে রকম কিছু গঙ্গার ঘাটে আলাদা ব্যবস্থা আছে। সেই সময় বড়লোক কিংবা ঠাকুর বাড়ির অনেকেই অভ্যাস ছিলো গঙ্গায় পালকি ডুব দিয়ে স্নান করা। আবার অনেক বড়লোক বাড়ি মহিলাদের গঙ্গার স্নানের সময় সেই যাগয়াটা ব্যারিকেড করে নেওয়া। কিন্তু সাধারণ মহিলাদের গঙ্গার স্নানের সময় সেই রকম কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সেই সময় অনেক ছেলেরা গঙ্গার ঘাটে আসে পাশে ঘুর ঘুর করতো। যেই সময় কথা বলছি তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হাত থেকে, ক্ষমতা ইংল্যান্ড রাণীর হাতে চলে গেছে। মহারাণীর কলকাতার উপর একটু বেশি নজর তার উপর মহারাণী নতুন হুকুম জারি করেছেন। সেই হুকুম জেরে বনেদি পরিবারের মেয়েরা নাকি মেমসাহেবদের মতো হাতে হাতমোজা পরতো আবার টেবিল কে এমব্রয়ডারি করা জামা পড়তে হতো, ব্রিটিশদের মতো ডিনার টেবিলের নিয়ম কানুন শিখতে হতো। বিশেষজ্ঞদের এই সময়টিকে বা মহারাণীর এই আদেশ টিকে ‘পিউরিটান যুগ’ বলে উল্লেখ করেছেন। যেহেতু কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী রাণীর একটু বেশি নজর ছিল কলকাতার উপর। 
রাণী ভিক্টোরিয়া 


মেজিস্ট্রেটদের রাতের ঘুম চলে গেল, রাণী যদি এই সবকথা জানতে পেরেছেন তাহলে তো গেল! মেজিস্ট্রেটরা সশস্ত্র বাহিনী কে কাজ লাগালেন, কিন্তু কিছুই লাভ হলো না। এইরকম এক সময় রাজেস্থানের ব্যাবসয়ী রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি এসে দেখলেন এইরকম পরিস্থিতি কিছু করা দরকার, তার পরিবারের মেয়ে বৌ রাও তো গঙ্গা স্নান করবেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মানে যে মহিলাদের গঙ্গার স্নানের সময় পুরুষরা ঘোরাঘুরি করবে এতো আর হোতে দেওয়া যেতে পারে না। তিনি ঠিক করলেন আলাদা ঘাট বানাবেন শুধু মাত্র মহিলাদের জন্য, এই ঘাট সম্পুর্ন ঘেরা থাকবে। এই গঙ্গার ঘাট ছিল কী শুধু মাত্র রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা পরিবারের সদস্যদের ব্যাবহার করতো ? না এই গাঙ্গার ঘাট ছিল সাধারণ মানুষের জন্য, মানে সব পরিবারের মহিলারা এই ঘাট ব্যাবহার করতো । এই ঘাট "RAM  CHANDRA  GOENKA ZENANA BATHING GHAT" বা জেনানা ঘাট নামে পরিচিত। এই গঙ্গার ঘাটটি এখনো আছে। এই স্থাপত্য টি উল্লেখ্য যে এই ঘাটটির চারটে মিনার আছে এবং গম্বুজ বিশিষ্ট, দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ছোট্ট একটা লখনৌ বা অনেকে মজজিদ বলে ভুল করেন। 
রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা ঘাটের চারটি মিনার ও গম্বুজ 


ঘাটটির মেঝে ছিল মার্বেল পাথর কাজ আর রঙিন টাইলসের ব্যাবহার আলাদা মাত্রা এনে দেয়। বলা হয় যেখানে জামাকাপড় বদলানোর যায়গা ছিলো, সেই যায়গা টা ছিলো খুব সুন্দর, আর দেওয়াল গুলিতে রঙিন টাইলসের ব্যাবহার। 
রঙিন টাইলস 



আর বলাই বাহুল্য যে রাজস্থানি কাজ। রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা সমাজের কল্যাণের জন্য অনেক কাজ করেছেন। পরোপকারের জন্য ওনার অনেক নাম ছিল। 
রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা ঘাটের ভিতরে


মনে করা হয় 1880 থেকে 1900 সালের মধ্যে এই ঘাটটি তৈরি হয়েছিল। কালীঘাট রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা সাধারণ মানুষের জন্য যাত্রী নিবাস তৈরি করেছিলেন, এখনো সেই যাত্রী নিবাস আছে তবে, সেই যাত্রী নিবাস টি এখন মিশনারিজ অফ চ্যারিটি ব্যাবহার করছে, দুঃস্থ মানুষের দের জন্য।
সেই যত্রী নিবাস 


 রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা ছিলেন কলকাতার পিঁজরাপোলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কলকাতায় বিধবা সহায়ক সমিতির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 1899 সালে। এছাড়া তিনি কলকাতার মাড়োয়ারিদের প্রথম সামাজিক সংগঠন তৈরি করেন। আরো জানা যায় রাজেস্থানের দুন্দলদে একটি কুপ তৈরি করেছিলেন। রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা ছিলেন স্যার হরিরাম গোয়েঙ্কা ও স্যার বর্দিদাশ গোয়েঙ্কার বাবা। রামচন্দ্র গোয়েঙ্কার নাতিদের কিন্তু আমরা কম বেশি সবাই চিনি, নাম বললেই বুঝতে পারবেন ভারত তথা কলকাতার অন্যতম ব্যাবসায়ী হর্স এবং সঞ্জীব গোয়েঙ্কা হলো রামচন্দ্র গোয়েঙ্কার নাতি । আগে বলেছি যে এই ঘাটটি এখনো আছে এবং ঘাটে বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে লেখা RAM  CHANDRA  GOENKA ZENANA BATHING GHAT. কিন্তু এখন এই ঘাটের অবস্থা কী ? জানা যায় যে যেহেতু পাশেই ফুলের বাজার, তাই ফুল ব্যাবসাই এই ঘাট টি কে গুদাম হিসাবে ব্যবহার করে।
Time's of India খবরের মাধ্যমে জানা গেছে, এ এই একশো বছর পুরনো ঘাটটির মালিক এখন কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট এই ঘাটকে একটি সংস্থার কাছে লিজ দিয়েছিলো তার এই স্থানে বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখার গোডাউন ব্যাবহার করেছিলো এবং ঘাটটির Collapsible gates ভেঙ্গে দেওয়া হয় যাতে আরও মাল পত্র ধোকানো যেতে পারে। এমনকি তার কারুকার্য যুক্তো টালি দেওয়া অংশটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন দেওয়ার করার কথা ভেবে ছিলো। কিন্তু কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট এই কাজ বন্ধ করে দেয়। আরো জানা যায় হেরিটেজ বিশেষজ্ঞ এবং কর্মীরা ঐতিহাসিক ঘাটটিকে গোডাউন হিসাবে ব্যবহার এই ঘাটিকে গুদাম হিসাবে ব্যবহার করার পক্ষপাতি ছিলেন না। তার চেয়েছিলেন যে এই  ঐতিহাসিক ঘাটকে যেন আর ক্ষতি মুখে না পরতে হয় এবং আর অবনতি না করে সাধারণ মানুষের পথচলতি হয়ে ওঠে এবং জনসাধারণের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে এই ঘাট দেখার জন্য। আরো একটা ঘাটের কথা এখানে বলে রাখা দরকার সেই ঘাটটি হলো রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা জেনানা ঘাট ঠিক পাশেই রয়েছে গুনপুট রায় কায়ানি ( Gunput Ray Kayani Lady’s Ghat ) এই ঘাটটি তৈরি হয়েছিলো মহিলাদের গঙ্গার স্নানের জন্যই, কিন্তু ঘাটে কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। 
Gunput Ray Kayani Lady’s Ghat


যদি ঘাটটি সম্পর্কে জানতে পারেন অবশ্যই জানাবেন এই অনুরোধ রইল। ও হ্যাঁ সকালে ঘাটটির একধারে নাকি পায়রা কে গম খাওয়ানো হয়, আবার তাদের জলের ব্যাবস্থা আছে, পায়রাদের তেষ্টা মেটানোর জন্য। 

গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক, অনেক জল কিন্তু এখন রয়েছে রামচন্দ্র গোয়েঙ্কা জেনানা ঘাট, যেই ঘাট এক সময় নারীদের সম্মান রক্ষা করেছিল। সেই জন্য বলা হয় Nothing Like Kolkata! 


ছবি সূত্র - Internet এবং Facebook


























































































































Comments