দোল বা হোলি কথা !

পুরনো কলকাতার দোল উৎসব 

 

দোল পূর্ণিমা নিশি নির্মল আকাশ, মৃদুমন্দন বইতেছে মলয় বাতাস । প্রতি বৃহস্পতিবার এই কথাগুলো আমরা শুনতে পাই, সেই দোল পূর্ণিমা আর কদিন পরেই । দোল পূর্ণিমার সাথে বাঙালি এবং অবাঙ্গালীতে মিলন জড়িয়ে আছে , বাঙালির কথা আছে ১২ মাসে ১৩ পার্বন এমনি অন্যতম পার্বণ হলো দোলযাত্রা । আবার দোলযাত্রার পরের দিন ও অবাঙালিরা মেতে ওঠে হোলি খেলা কে লক্ষ্য করে দেখবেন দোল অথবা হোলি একইদিনের পরে না । পরে কিন্তু হোলি হয়। দোল পূর্ণিমার সাথে জড়িয়ে আছে পুরাণের বিভিন্ন গল্প আবার হোলির সাথেও আছে জড়িয়ে পুরাণের গল্প । 

ন্যাড়াপোড়া বা হোলিকা দহন 


দোলের আগের দিন ন্যাড়াপোড়ানো হয় আবার হোলির আগের দিনও হোলিকা দহন হয় । লক্ষ্য করে দেখুন অর্থাৎ মিল টা । ভেবেছি পুরাণ ও ঐতিহাসিক মতামতটি আলাদা ভাবে বলবো । পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের, শুল্ক পক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে দোল উৎসব পালন করা হয়।

পুরাণের মতামত টি আগে বলছি । শুধুমাত্র বাংলায় দোল আর সারা ভারতের এই, উৎসবটি হোলি নামে পরিচিত । এই হোলি কথাটি উৎস, হিসেবে বলা হয় হোলক শব্দ কে । হোলির আগের দিন হোলিকা দহন করা হয় । একটি মত বলছে, বাসন্তি পূর্ণীমার আগের দিন মামা কংশ, কৃষ্ণকে বধ করার জন্য, শেষ রাক্ষস কেশী কে পাঠিয়েছিল। শ্রী কৃষ্ণ এই কেশী রাক্ষস কে, যমুনার কেশীঘাটে বধ করেন । আর সেই জন্য শ্রী কৃষ্ণের আরেক নাম কেশব, বলে রাখা ভালো এই কেশী রাক্ষসের অনেক বড় বড় কেশ ছিল , সে জন্য নাম কেশী । ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী এই রাক্ষসের বধের আনন্দেই, হোলি উৎসব পালন করা হয়।  পুরাণ অনুযায়ী হোলির আগের দিন পালিত হয়, হোলিকা দহন। হোলিকা হলো হিরণ্যকশিপুর এক বোন, হিরণ্যকশিপু খুব রাগ বিষ্ণুর উপর, কারণ হিরণ্যকশিপুর ভাই হিরণ্যক্ষ কে হত্যা করেছিল । সেই জন্য হিরণ্যকশিপু তার রাজ্যে বিষ্ণু পুজো ব্যান করেন , আর যারা বিষ্ণু করতো তাদের কে মৃত্যুদন্ড দেয় । এই হিরণ্যকশিপু এক ছেলে ছিল নাম তার প্রহ্লাদ সে আবার বিষ্ণু ভক্ত, রোজ পুজো করে বিষ্ণুর আবার বিষ্ণুর আশীর্বাদ প্রাপ্ত বটে । ছেলে কে নিয়ে কি করবে হিরণ্যকশিপু । হিরণ্যকশিপু ঘোর তপস্যা করলেন, মন্দার পাহাড়ে বসে । ব্রহ্মার বর পেলেন যে কোনো দেব, দৈত্য, দানব কেউ তাকে মারতে পারবে না । প্রহ্লাদ কে তো ছাড়া যাবেনা, একটা প্ল্যান করলেন তার এক বোন ছিল, নাম হোলিকা সে নাকি আগুন পোড়ে না, আবার আরো একটা তথ্য বলে যে এই হোলিকা কাছে অদৃশ্য হওয়ার একটি চাদর ছিল, হ্যারি পটারের মতন । তো ঠিক করা হলো হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে বসবে, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে সময় মতো ঐ চাদর ব্যাবহার করে বেঁচে যাবে হোলিকা, পুড়ে যাবে। সব ঠিক, প্ল্যান মত সব চলছিল, কিন্তু হঠাৎ ঐ চাদর উড়ে গিয়ে পড়লো প্রহ্লাদের উপর, প্রহ্লাদ বেঁচে গেল আর পুড়ে গেল হোলিকা । হিরণ্যকশিপু কিন্তু ছাড় পায়নি, বিষ্ণুর নরসিংহ অবতারে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেছিল। পুরাণে হোললিকা দহন, কে আমাদের বাংলায় বলা হয় ন্যাড়া পোড়া বা বুড়ির ঘর । মানে অশুভ শক্তির বিনাস করে, পরের দিন শুভ শক্তির জয়ী হওয়ার আনন্দে দোল বা হোলি খেলা হয় । 

শ্রীচৈতন্য


বাংলায় আমার বলি ন্যাড়া পোড়া, এইটা হল বৈষ্ণব রীতি মেনে, চাঁচর বা ন্যাড়া পোড়া । চাঁচর শব্দের অর্থ নাকি কোঁকড়ানো ‌। চণ্ডিদাস লিখেছেন চাঁচড়া কেশের চিকন চুড়া। এই দোল পূর্ণিমার তিথিতে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু । শ্রীচৈতন্য দেবের প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম চর্চা, মানুষেকে দোল উৎসবের দিনে উৎসাহিত করে তোলে। 

আসলে দোল বা হোলি খেলা হয় শ্রীকৃষ্ণ, রাধা ও তার গোপীদের সঙ্গে রঙ খেলায় মত্ত ছিল । নারদ পুরাণ কিংবা ভবিষ্য পুরাণে হোল খেলার উল্লেখ আছে । 

রঙ খেলায় রাধাকৃষ্ণ 


তবে এই হোলি বা দোল খেলা আমরা জানি শ্রী কৃষ্ণ সময় থেকে শুরু, কিন্তু বিভিন্ন পুরাণ অনুযায়ী প্রায় দু হাজার আগে, গোকুলে ইন্দ্রদ্যুম্ন শুরু করেছিল । ইতিহাস ঘাঁটলে এই নাম অনেকবার এসেছে , কিন্তু এই ইন্দ্রদ্যুম্ন আসলে কে ছিলেন সেই বিতর্ক রয়েছে । Google অনুযায়ী সূর্যবংশিয় রাজা, ইন্দ্রদ্যুম্ন মহাভারতেও আছে । ইন্দ্রদ্যুম্নের বাবা হলেন সুমতি আর  ইন্দ্রদ্যুম্নের ভরতের  নাতি । ইতিহাসে যখন এসে পড়েছি তাহলে বলি এবার ইতিহাসের কথা, ঐতিহাসিকদের মতে আর্যর এই উৎসব পালন করতো । আবার সপ্তম শতাব্দীতে এক শিলালিপি তে হর্ষবর্ধন সময়ে হোলি খেলা হয়েছে । শ্রীহর্ষের রন্তাবলি অথবা দন্ডির দশকুমারচরিতে হোলি খেলায় উল্লেখ আছে ।

আল বিরুনীর হোলি খেলার উল্লেখ করেছেন , এছাড়া ও মোগলদের সময় হোলি খেলা হতো কারণ মোঘলদের বিভিন্ন ছবিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

হোলি খেলছেন সম্রাট ও বেগম 


মোঘল এই উৎসবের নাম রেখেছিল, ঈদে-হুলামি, ঈদের মতোই হোলি তারা খুব ধুমাকরে পালন করতো । লালা কেল্লার পিছনে যমুনা নদীর তীরে মেলা বসতো হোলির দিন । তখন তো এখনকার মতো ক্যামিকাল যুক্ত রঙ ছিল না, তখন পলাশ ফুল থেকে তৈরি হতো গুলাল । ঐ মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে গাইয়ে বাজিয়েরা আসতো ঐ মেলায়, আর এই সব দেখতেন বেগমরা প্রাসাদের ঝারোখার ফাঁক দিয়ে। শোনা যায় পলাশ ফুলের তৈরি রঙ সম্রাট জাহাঙ্গীর তার বেগম  নূরজাহান কে মাখিয়ে দিতেন । শোনা যায় বাহাদূর শাহ্ জাফর নিজেই হোলির গান করতেন । 

লালদিঘী 


ব্রিটিশ যখন ভারতের এসে হোলি খেলা, দেখা তাদের রোমানদের উৎসব "ল্যুপার ক্যালিয়া" বা গ্রীকদের "ব্যাকানালিয়া" উৎসবের সঙ্গে তুলনা করেছিল । কলকাতার সঙ্গেও হোলি বা দোল একটা ঘটনার অতপ্রত ভাবে জড়িত, বলহয় যে সাবর্ন রায়চৌধুরীদের কুল দেবতা শ্যামরায়ের মন্দির ছিল লালদিঘী তে এই মন্দির ঘিরে দোল উৎসব শুরু হয়, শোনা যায় দোলে রঙ খেলার সময় পুকুরে রঙ লাল হয়ে যায়, আর তারপর যায়গার নাম হয় লালদিঘী আর তারপর থেকেই লালাবাজার লাল চার্চ নাম হয় বলে শোনা যায়, এই নিয়ে বিতর্ক রয়েছে ।  

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি 


জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেও ধুমধাম করে দোল উৎসব পালন করা হতো, ব্রাহ্ম হলেও তারা দোল উৎসব পালন করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ঠাকুর বাড়ির দোল উৎসব পালন গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন, দোলের দিন ঠাকুর পরিবারের মেয়ে বা বৌদের আলাদা সাজ ছিল হালকা মসলিনের শাড়ি, ফুলের গয়না গোলাপের গন্ধ মাখা মালা । দোলের দিন সাদা রঙের মসলিনের শাড়ি কারণ ছিল, আবিরের রঙ সাদা মসলিনের শাড়ি তে ফুটে উঠবে । ঠাকুরবাড়ির কথা যখন উঠেছে, এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, গুরুদেবের লেখার ক্ষেত্রে বসন্ত কাল বারবার ধরা দিয়েছে, বর্ষাকালের পর বসন্তেকালকে নিয়ে গুরুদেব গান রচনা করেছেন । এই নেড়া পোড়া  হোলিকা দেহেন একটা সামাজিক গুরুত্ব আছে। শীতের ঝরা পাতা ও বিভিন্ন আবর্জনা কে পুড়িয়ে সাফ করার মাধ্যমে কিছুটা তাহলেও পৃথিবীতে পরিষ্কার করার কাজ হতে পারে । অন্য দেখতে গেলে তা বৈজ্ঞানিক কারণও আছে ঋতু পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে বসন্তকালে বিভিন্ন রোগ এর সৃষ্টি  হয়  হয়তো তার উদ্দেশ্যেই ডালপালা, আবর্জনা পুড়িয়ে তার চারপাশে গোল করে  "আজ আমাদের নেড়া পোড়া কাল আমাদের দোল পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল হরি বল" এই বলে, নাচ করে আনন্দ দেয় । হোলির দিন রঙ খেলার পাশাপাশি,  অন্যতম ছিল বা আছে খাওয়া-দাওয়া, 



হোলির দিন, এক ধরনের বিশেষ পানীয় পান হয় তার মধ্যে আবার ভাঙ্গ থাকতো সেটি, ঠান্ডাই নামে পরিচিত । খুব যত্ন করে প্রস্তুত করা হতো বা  হয় এই পানিয় তে থাকে দই, দুধ, ক্ষীর তার সঙ্গে মিশানো বাদাম কুচি, গোলাপ ফুলের শুকনো পাপড়ি আর থাকে কেশর, পেস্তা, কেউ নেই এই পানীয় অত্যন্ত সুস্বাদু এবং মহার্ঘ দুটোই ।  এরকমই মিষ্টি হোলি খেলার পর এইসব মিষ্টি খাওয়া হয় এই মিষ্টি গুলি সাধারণত সন্দেশ টাইপের হয়ে থাকে বিশেষ করে থাকে, বরফি । আর একটা আর একটা মিষ্টি খুব জনপ্রিয়, তা হলো ফুটকড়াই । 


আবার কলকাতা ফেরা যাক, ব্রিটিশ আমলে তোদের জন্য সরকারি ছুটি দেয়া হতো তবে, একদিনের না সেই ছুটি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি 1787 সালের সরকারি ছুটির তালিকা থেকে জানা যায় যে দুর্গাউৎসব যেখানে আট দিন থাকতো দোলযাত্রা সেদিন ছুটি থাকত পাঁচ দিন । হোলি দোল যাত্রা কোন একটি ধর্মের মিলন নয় , সব ধর্মের মিলন হয় উৎসবের মাধ্যমে, কিন্তু আর এক বন্ধুকে রঙ মাখিয়ে গল্প গুজব করে ঠান্ডাই খেয়ে, সেলিব্রেট করাই হল দোল বা হোলি ।

  

ছবি সূত্র - internet

তথ্য সূত্র - wikipedia

https://tv9bangla.com/spiritual/why-colors-are-played-on-the-day-of-dol-purnima-528879.html


https://zeenews.india.com/bengali/lifestyle/dol-purnima-2022-significance-of-colour-festival-specially-in-bengal-chaitanya-mahaprabhu-rabindranath-tagore_424589.html


https://banglalive.com/mythology-of-holy/


আরো পড়ুন - https://www.chaloamaragalpakori.com/2023/02/blog-post_26.html

Comments