স্বর্ণলতা স্ট্রিট, উপন্যাসের নামে রাস্তা !

স্বর্ণলতা বই

 

কল্লোলিনী কলকাতা সঙ্গে জড়িয়ে আছে, বিভিন্ন না জানা কথা, কিংবা না জানা ইতিহাস। একসময় তো ইংরেজদের রাজধানী ছিল আমাদের তিলোত্তমা কলকাতা। কলকাতায় যে কত রাস্তা আছে বা রাস্তার ভিতরেও কত গলি আছে , তা হয়তো গুনে শেষ করা যাবে না । সেই রকমই কি রাস্তা কথা বলেছি আজকে, আসো দেখি কোন রাস্তা‌ ? 



স্বর্ণলতা নামটা শুনলে প্রথমে মনে পড়বে কোনো গাছের নাম, বা কোনো নারীর নাম কিন্তু আমাদের কলকাতার শহরে একটি রাস্তার নাম স্বর্ণলতা স্ট্রিট। বিশ্বকোষ লেনের কথা তো আগেই বলেছি , এখন বইমেলা চলছে তাহলে এবার বলি স্বর্ণলতা স্ট্রিটের কথা, স্বর্ণলতা  আসলে একটা উপন্যাসের নাম, এই নামে রাস্তা আছে আমাদের কলকাতায় তাহলে  চলুন ঘুরে দেখি কলকাতা । 


যখন বাংলা সাহিত্যে সূর্য মতো তাপপ্রবাহ দিচ্ছে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার লেখা বাঙালি কে উপন্যাস নতুন করে পড়া ও লেখা শিখিয়ে দিচ্ছেন উনি । বলাহয় তার রোমান্টিক ধাঁচের উপন্যাস, সবাই যে খুব পছন্দ করছে তা কিন্তু নয়, বরং তার লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস বেশি ভালো লাগছে মানুষের। তবে অনেকে মনে করতেন মধ্যবিত্ত পরিবারের মননে বা সামাজিক উপন্যাস লেখার তাগিদ তিনি মনে করেননি । সেই সময় মানে 1872 - 73 সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হতো জ্ঞানাঙ্কুর নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ পাচ্ছিল , আর ঐ পত্রিকায় একটা নতুন উপন্যাস প্রকাশ পেতে শুরু করে , নাম স্বর্ণলতা ।

প্রকাশ পর থেকেই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে স্বর্ণলতা । 1874 সালে তো বই হিসেবে প্রকাশ পেল স্বর্ণলতা । 

স্বর্ণলতা জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, কিন্তু তার সাথে রেখেছিল একটা রহস্য। পত্রিকা কিংবা বইয়ে কোনো যায়গায় লেখকের নাম ছিল না , অনেকই জানতে চাইতেন লেখকের নাম কি ? কলেজ স্ট্রিটের ক্যানিং লাইব্রেরী থেকে প্রকাশিত হতো এই বইটি, শুধু বইটি তে লেখা থাকতো শ্রী যোগেশচন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত। সেই জন্য কিন্তু বই বিক্রি আটকেয় নি । নয় বছর মধ্যে স্বর্ণলতা বইটির তিনটি এডিশন বিক্রি হয়ে গেছিল, এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল স্বর্ণলতা । অনেকে তো লেখকের নাম না থাকার সুযোগ নিয়ে, নিজেকে ই স্বর্ণলতার লেখক বলে দাবি করতো । তবে অনেকে মনে করতো বঙ্কিমচন্দ্রই নাকি আড়ালে এই বইয়ের লেখক । এই সব জল্পনা কল্পনা মধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন স্বর্ণলতা বইয়ের প্রকাশক যোগেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় আর স্যাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, এর কারণ এই দুজন একমাত্র জানতেন লেখকের আসল পরিচয় । প্রকাশক বারবার অনুরোধ করেছিল লেখকে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে, কিন্তু প্রতিবারই তিনি না বলেছিলে প্রকাশক যোগেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় কে, কিন্তু চতুর্থ এডিশনের সময় প্রকাশক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জোর করেই লেখকের নাম দিলেন । এবার প্রকাশ্যে আসলো স্বর্ণলতা বইয়ের আসল লেখকের নাম। 1883 সালে চতুর্থ এডিশনে স্বর্ণলতা লেখকের নাম দেখা গেল তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, উনি ভবানীপুর অঞ্চলের বাসিন্দা, পেশায় চিকিৎসক । সাহিত্য চর্চা ওনার শখ , বই প্রকাশের ইচ্ছা তার কোনো কালেই ছিল না ‌। শুধুমাত্র বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রোমান্সধর্মি উপন্যাসের বাইরে ও অন্যরকম উপন্যাস ও লেখা যায় সেই তার উদ্দেশ্য ছিল, সেই জন্য তিনি স্বর্ণলতা লেখা ও প্রকাশিত করা । 

তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

স্বর্ণলতা এত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তাই জনপ্রিয়তার চাপে পড়েই এরপর আরো চারটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

কিন্তু কোনো ভাবেই স্বর্ণলতার মত জনপ্রিয়তা লাভ করে নি ঐ উপন্যাস গুলি। ঐ চারটি উপন্যাস ছিল ললিত সৌদামিনী, হরিষে বিষাদ, অদৃষ্ট এবং তিনটি গল্প । কিন্তু সাহিত্য জগতে বড় আসন পাননি তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

সুকুমার সেন স্বর্ণলতা সম্পর্কে বলেছেন " বঙ্কিমের ভাষা সৌভাগ্য তারকনাথের ছিল না, তবে বঙ্কিমের রচনার মতো সরসতা এবং কাব্যশ্রী না থাকিলেও, স্বর্ণলতার ভাষা সরল প্রাঞ্জল এবং বর্ণনীয় বিষয়ের বিশেষ উপযোগী । ভাষার আভরণহীনতা বিষয় বস্তুর পক্ষে নিরতিশয় শোভন হইয়াছে ।" এই ভাষা সারল্যই তাকে ব্যাক্তিক্রমী রেখেছে । সেই জন্য বলা হয় তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে গেছিলেন তিনি । 

সুকুমার সেন 

এইবার একটু দেখা যাক, তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় কে 1843 সালে 31 অক্টোবর মাসে বাগআঁচড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেছিলেন তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় । বাগআঁচড়া গ্রামটি নদিয়া জেলার অন্তর্গত। বলা হয় তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় যেদিন জন্মগ্রহন করে ছিলেন, সেদিন নাকি খুব বৃষ্টি হয়েছিল । শোনা যায় তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় বাবা মহানন্দ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন খুবই ধার্মিক ব্যাক্তি । মহানন্দ চেয়েছিলেন ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে, সেই জন্য দশবছর বয়েসে তারকনাথ কে পাঠিয়েছে দিয়েছিলেন কলকাতায়, অম্বিকাচরনের কাছে নতুন পড়াশোনা শুরু করলেন তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

অম্বিকাচরন ছিলেন তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের খুড়তুতো ভাই । কলকাতার ভবানীপুর মিশনারি সোয়সাইটি স্কুলের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করে , ভর্তি হন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে সালটা ছিল 1863.

তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এল. এম. এস পাস করেন 1869 সালে । আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় কে, সহকারী অ্যাসিসটেন্ট সার্জন হিসাবে প্রথম কাজ শুরু করেন তিনি, কাজের সূত্রে তিনি বাংলার বিভিন্ন যায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। আবার তিনি যখন ভ্যাকসিন সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন সেই সময় তিনি , বাংলার মানুষ জীবন যাত্রা কে খুব কাছ থেকে দেখে ছিলেন তিনি, আর সেই সব মানুষের জীবনের রষদ তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার সাহিত্যে । আর এই সাহিত্য চর্চা জন্য তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন । বলা হয় রাজশাহী মাটি থেকেই তিনি শিখেছিলেন সাহিত্যের অ আ ক খ, বাংলাদেশের রাজশাহী শহর থেকেই হাতে খড়ি হয় সাহিত্যিক তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের , বলা হয় যে রাজশাহী শহরের সঙ্গে একটা টান আছে তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের, আসলে সাহিত্য কোনো কাঁটা তারের বেড়া মানে না । এক সময় রাজশাহীতে বেড়ে উঠে ছিল, বাংলার সেন বংশের রাজা বিজয় সেন । যেহুতু তিনি চিকিৎসক ছিলেন সেই জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছিলেন তিনি, একসময় তিনি উত্তরবঙ্গে ছিলেন তিনি, আবার একসময় তিনি সেন্ট্রাল জেলের চিকিৎসক পদে অধিন ছিলেন। তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় স্বর্ণলতা বইয়ের সাট টি এডিসন তার জীবদ্দশায় তেই প্রকাশ পেয়েছিল। স্বর্ণলতা উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ হয়েছিল। স্বর্ণলতা  ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন দক্ষিণাচরণ রায়। শুধু তাই স্বর্ণলতা উপন্যাসটির নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল, স্টার থিয়েটারে উপন্যাসটির নাট্য রুপের নাম ছিল " সরলা " অনেক প্রশংসা পেয়েছিল নাটক টি , এই নাটকটির মূল কান্ডারী ছিলেন অমৃতলাল বসু । 

অমৃতলাল বসু 


তবে এইসব তো গেল সাহিত্য ও সাহিত্যিক তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় নিয়ে আলোচনা । কিন্তু প্রথমেই যে কথাটা বলেছিলাম  কিভাবে হলো রাস্তা নাম স্বর্ণলতা। উপন্যাসের এতোটাই জনপ্রিয়তা ছিল যে, একটি রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল এই উপন্যাসটির নামে । উনবিংশ শতকের সময় কেউ যখন ভাবতেই পারিনি, তখন কলকাতায় রাস্তার নাম রাখা হয় উপন্যাসের নামে ! তবে কখন এই নাম রাখা হয়, সেটা ঠিক জানা যায়নি, হয়তো সয়ং লেখক জানতে না এই ব্যাপারে। তবে একটুকু সময় টা বিশ শতকের আগেই। এখন যেমন মধ্য প্রাচ্যের দেশ গুলি তথা প্রথম বিশ্বের দেশ যেযন ইউরোপ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড বইয়ের নামে রাস্তার নামকরণ করছে তার বহু আগে আমাদের কলকাতায় আছে বইয়ের নামে রাস্তা । তবে একটা নয় দুটো , ঐ যে প্রথমেই বলেছি বিশ্বকোষ লেন ।

সেই জন্য অনায়াসে বলাই যে Bengal thinks today world think tomorrow. 

স্বর্ণলতা স্ট্রিট 

আচ্ছা এই যে এতক্ষণ ধরে বললাম বা আপনারা পড়লেন এই এই রাস্তাটি কোথায়, কলকাতায় বিখ্যাত দুর্গা পুজো ম্যাডক্স স্কয়ার তার পাশে হাজারা রোড তার পাশেই গা ঘেঁষে ছোট্ট একটি রাস্তা আছে , সেই রাস্তার নাম হলো স্বর্ণলতা স্ট্রিট ।  


ছবি সূত্র - internet

তথ্য সূত্র - https://inscript.me/almost-forgotten-novelist-taraknath-ganguly/


https://kavishala.in/@524235899406498/myadaksa-skoyara-sbarnalata-o-tarakanatha


https://pagefournews.com/taraknath-gangopadhyay-swarnalata-street/


https://www.prohor.in/kolkata-street-named-after-novel#:~:text=%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A1%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8%20%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A7%87%20%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A6%BE%20%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%B0,%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%87%20%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%20%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%A8%E0%A7%8B%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%B0%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A5%A4

Comments