বর্গী ও মারাঠা ডিচের অজানা গল্প

কলকাতার মানচিত্র 

 

আমাদের ছোট বেলায় একটা ছড়া সবাই শুনেছে আর এখন যারা ছোট আছো তারাও শুনছে , ছড়াটি  হলো ‘ছেলে ঘুমোলো পাড়া জুড়োল/ বর্গি এল দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেব কি সে...’ কিন্তু এই ছড়াটি এসেছে কোথা থেকে আসুন জেনে নি সেই ছড়াটির ইতিহাস! 

   

চলুন শুরু করি একদম শুরু থেকে, 


আফ্রিকার ইথিওপিয়ার হারারে এক 1550 সালে গরিব পরিবারের জন্ম হলে এক সন্তানের নাম চাপু ( shapu ), বাবা এতই গরীব যে তাকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হল। ছোট ছেলেটি হয়ে গেল ক্রীতদাস, মালিকের কাছে বিক্রি হয়েছিলেন, তিনি এই ছেলেটির নাম দিলেন আম্বার। অনেক মালিকের হাত ধরে বাগদাদ এসে পৌঁছায় আম্বার, নতুন মালিক মীর কাসিম আল বাগদাদী লক্ষ্য করলেন আম্বার  আর সব ক্রীতদাসের থেকে একটু আলাদা তাই তিনি আম্বার শিক্ষিত করে তুললেন, এবং নিয়ে এলেন তৎকালীন ভারতবর্ষে ওখানে এসে আবারও দেখল তার মালিক একসময় ক্রীতদাস ছিল, সেই ও ছিল কৃষ্ণঙ্গ যেটা নাকি তখন হামেশাই হয়ে থাকতো। আম্বার জন্য যুদ্ধ করতে লাগলো এবং একেবারে হয়ে বসলো কিং মেকার, শোনা যায় আহমেদনগর সুলতান কে খুব জ্বালাচ্ছে মোঘলরা, তাই আম্বেরের উপর দায়িত্ব পড়ল মোঘলদের সঙ্গে যুদ্ধ করার, কিন্তু আম্বার হিসেব করে দেখলো, এই  শত্রুদের সঙ্গে সামনা সামনি যুদ্ধ করা যাবে না। আম্বার লক্ষ্য করলেন এরা একটু অন্য, এবং এদের সাথে যুদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছিল, আম্বার  তাই নতুন টেকনিক বার করলেন। হঠাৎ করে মোঘলদের উপর আক্রমন করা মানে কেউ যখন তৈরী না যুদ্ধের জন্য সেই সময় হামলা করলেন, আম্বার কম  ঘোড়া আর কম সৈনিক নিয়ে আক্রমন করলেন। মোঘলদের রসদ লুঠ করলেন , তাঁবু পোড়ালেন এবং প্রতিআক্রমণ করার আগেই ভ্যানিশ হয়ে যেতেন । আম্বার এই নতুন যুদ্ধ কৌশলের  নাম রাখলেন বার্গীর গিরি । আম্বার তখন যেখানে ছিলেন, সেই জায়গাটা ছিল এখনকার মহারাষ্ট্র ফলে তার সাথে অনেক মারাঠা সৈনিক ছিল , এক মারিঠা সৈনিক তারকাছ থেকে এই শিক্ষাটি  শিখে নিলেন তার নাম ছিল সাহজী ভোঁসলে এবং সেই শিক্ষায় শিক্ষিত পড়লেন তার ছেলেকে মানে শিবাজী কে , এই বর্গীরা বাংলা আক্রমণ করেন 1741 সালে, কারণ ছিল নবাব আলীবর্দী খাঁ নবাব হয়েছেন তার আগের নবাব সরফরাজ খান কে যুদ্ধে মেরে নেওয়া হয়েছে, আলীবর্দী খাঁ ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার দাদু, তখন উড়িষ্যার নায়েব ছিলেন শারফরাজ খানের শালা রুস্তম জং এই কথা শুনে রুস্তম জং একটু আপত্তি করায় আলীবর্দী খাঁ উড়িষ্যা আক্রমণ করলেন এবং রুস্তম জং কে হারিয়ে উড়িষ্যা দখল করলেন।

আলীবর্দী খাঁ

রুস্তম জং  নালিশ করলে নাগপুরের মারাঠাদের কাছে, সেই শুনে রাঘুজি ভোঁসলে ভাস্কার পণ্ডিতে নেতৃত্বের ঘোড়সওয়ার পাঠালেন উড়িষ্যার জন্য কিন্তু সোনার বাংলা দেখে মাথা ঘুরে যায় ,ঘোড়সওয়ার বাহিনী পাঞ্চেত দিয়ে বাংলায় ঢুকে পড়লো ভাস্কার পন্ডিতের ঘোড়সওয়ারদের মারাঠা বলতো বার্গী আর বাংলায় বলা হতো বর্গী । 

বর্গী

এখানে আরও গল্প আছে, বলা হয় 1742 সালের এপ্রিল মাস চলছে  তখন দুবছর হলো আলীবর্দী খাঁ সিংহাসন দখল করেছে, সেই সময় ভাস্কর পন্ডিত একহাজার পদাতিক ও তিনহাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে আসলেন বর্ধমানে, উদ্দেশ্য চৌথসহ অন্যান্য কর আদায় করা । প্রথমে তো আলীবর্দী খাঁ পালিয়ে গেছিলেন, ভাষ্কর পন্ডিতের ভয়ে। বলাহয় ঐ 1742 সালেই মে মাসের 6 তারিখে , তৎকালীন বাংলার রাজধানী মকসুদাবাদে লুট রাজ চালায় ভাষ্কর পন্ডিত তার মারাঠা সৈন্য যা ছিল বাংলার কাছে বর্গী । বর্গী আক্রমণে হাত থেকে কিন্তু জগৎ শেঠের বাড়ি ও বাদ যায়নি।

এখানে প্রশ্ন ওঠে মুঘলদের কী হলো ?

মুঘলদের  তখন প্রায় দিল্লির সিংহাসন হাতাছাড়া হচ্ছে, মারাঠা সাম্রাজ্য বিস্তার করছে , ছোট ছোট জমিদাররা নিজেদের বিস্তার করছে । আসলে তো কর ছিল বাহানা, মূল কথা হল লুঠ করা । এখানে আবার এই লুঠরাজের বর্ণনা দিয়ে গেছে গঙ্গারাম চক্রবর্তী তার মহারাষ্ট্র পুরাণে 

“এই মতে জত সব গ্রাম পোড়াইয়া

চতুর্দ্দিকে বরগি বেড়াএ লুটিয়া।।

কাহুকে বাঁধে বরগি দিয়া পিঠ মোড়া

চিত কইরা মারে লাথি পায়ে জুতা চড়া।।

রুপি দেহ দেহ বোলে বারে বারে

রুপি না পাইয়া তবে নাকে জল ভরে।।” 


দশ বছর ধরে বর্গীরা বাংলা আক্রমণ চালু থাকলো গ্রাম পর বর্গীরা পুড়িয়ে দিলো প্রায় চার লাখ মানুষকে মেরে ফেলেছিল বর্গীরা , এবার ইংরেজরা ভয় পেতে শুরু করলো কারণ তাদের সাধের কলকাতার যদি এরকম অবস্থা হয় তাহলে কি হবে ?, মারাঠা আক্রমণ ঠেকাতে ব্রিটিশরা বিভিন্ন ভাবনা চিন্তা করছে আর ইংল্যান্ডে পাঠাচ্ছে । একদিন বাগবাজার ঘাটে এসে নোঙর করে, ট্রাইগ্রিস জাহাজ, জাহাজ এসে দাঁড়ালো পেরিনস পয়েন্টে । এই জাহাজ করে এসেছিল সাত টি কামান, শহরের সাত যায়গায় বসানো হলো এই কামান গুলি, কিন্তু তাও ভয় কমে না। 


কলকাতার বাইরে কামান বসে ছিল, কিন্তু সেটা ব্রিটিশরা বসাই নি। 


বাংলার বিষ্ণুপুরের বর্গীদের আক্রমণ ঠেকাতে, বিষ্ণুপুরের মল্লরারজা বীর হাম্বীর তৈরি করালেন এক বিশাল কামান, তার নাম রাখলেন দলমর্দ্দন । তবে এখন লোকোমুখে নাম হয়েছে, দলমাদল । এখনো কিন্তু এই কামান আছে এবং বিষ্ণুপুর গেলে দেখাযাই এই কামান টি, আরো একটা জিনিস লক্ষ্যনিয় যে এই কামানে এখনো মরচে পড়েনি। কামান টি লম্বায় বারো ফুট পাঁচ ইঞ্চি, আর পরিধিতে এগারো ইঞ্চি। এই কামনটির গায়ে ফরাসি ভাষায় লেখা যে সেই সময় কামানটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল 1লাখ 25 হাজার টাকা।  


দলমাদল


কিন্তু পুরো  কলকাতাকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা সম্ভব না তাই ব্রিটিশরা ঠিক করল খাল কাটবে, পশ্চিম পশ্চিমী তো গঙ্গা আছে তাই পূর্ব দিক দিয়ে খালকাটা সিদ্ধান্ত নেয়া হলো এখানে নাম দেয়া হয়েছিল মারাঠা ডিচ ।

বাগবাজার থেকে খাল কাটা শুরু হবে অনেক টা গোল করে কাঁটা হবে এই খাল, পুবে ঘুরে দক্ষিণ যাবে এই খাল , আর সাত মাইল লম্বা, বিয়াল্লিশ গজ চওড়া হবে । আর এর জন্য খরচ হবে 25 হাজার টাকা । সেই সময় সাধারণ মানুষ ভাববে সাহেবরা ফেল করবে, সেই জন্য সেই সময়ে কলকাতার মানুষ নিজেরা নিজেদের রক্ষা করা জন্য খাল কাটতে শুরু করে , এই কলকাতা বাসির নাম হয়ে গেল ডিচার মানে পরিখা কাঁটা পাবলিক । টাকা কোম্পানি কাছ থেকে চাওয়া হয়েছিল, আর বৈষ্ণনবচরণ শেঠ, রাসবিহারী ও উমিচাঁদরা কথা দিয়েছিল জনগণ ফেরত দিয়ে দেবে এই টাকা !     

নর্থের শ্যামবাজার থেকে সাউথের 

এন্টালি, ছাড়িয়ে পার্কস্টীট ও চলে এসেছিল এই খাল ।

সাতমাইল খালকাটা সিদ্ধান্ত হল কিন্তু ছয় মাসে মাত্র তিনবার কাটা হয়েছিল কাগজে-কলমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল আরো লম্বা, কিন্তু দেখা গেল আলীবর্দী খাঁ চুক্তি করে নিয়েছেন মারাঠাদের সঙ্গে ,  আসল কথা হলো যে বেশ কায়দা করে একা ঘরে নিরস্ত্র অবস্থায় ভাষ্কর পন্ডিত কে মেরে ফেলা হয়, ভাষ্কর পন্ডিত কে । এর পরে অনেক মারাঠা দস্যুরা তেমন রঘুজি ভোঁসলে লুঠ চালায় বাংলায় , ওদের পেছনে ধাওয়া করে প্রান হারান আলীবর্দী খাঁ, কিন্তু কলকাতা অবধি আসেনি বর্গীরা।কোনো রফা হয়েছিল মারাঠা বর্গিদের তৎকালীন বাংলার নবাবের। 

1813 ব্রিটিশদের তৈরি বেঙ্গল, বিহার, উড়িষ্যার মানচিত্র 


ফলে তিন মাইল খালে আবর্জনা জমা হতে থাকে, তাই লর্ড উয়েলসলি খাল বোজাই ওর্ডার দিলেন, 1799 সালে সেই ভরাট খালে উপর তৈরি রাস্তা,

সেই সময় সার্কুলার রোড

আজকের নাম লোয়ার অ্যান্ড আপার সার্কুলার রোড । খালি বাগবাজারে থেকে গেছে মারাঠা ডিচ লেন নামের রাস্তা । এখনকার নাম A.J.C. BOSE Road  

মারাঠা ডিচ লেন 



ভারতচন্দ্রও 'অন্নদামঙ্গলে’ লিখে গেছেন 

শিবাজির দেশ মহারাষ্ট্র থেকে আসা এই ভয়ঙ্কর বর্গিদের কথা  

‘ছেলে ঘুমোলো পাড়া জুড়োল/ বর্গি এল দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেব কি সে...’ 


ছবি সূত্র - Internet

তথ্য সূত্র - দীপের চোখে কলকাতা 

 https://www.getbengal.com/details/when-maratha-bargis-could-have-taken-calcutta-but-didn%E2%80%99t


https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/marhatta-attack-in-kolkata-and-ditcher-kolkata


https://inscript.me/the-history-of-marathas-in-bengal


https://indianexpress.com/article/cities/kolkata/streetwise-kolkata-lane-maratha-ditch-8327641/




Comments