দেবী সরস্বতীর অজানা কাহিনী

দেবী সরস্বতী 

 

জয় জয় দেবী, চরাচর সারে কুচযুগশোভিত... 


পুরাণ মতে সরস্বতী হলো বিদ্যার দেবী। মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পুজো করা হয়। পশ্চিমে ভ্যালেন্টাইন ডে পালন করা হয়, কিন্তু সরস্বতী পুজো বাঙালি নিজের ভ্যালেন্টাইন ডে নামে ও পরিচিত । শিব ও পার্বতীর মেয়ে হলো সরস্বতী ঠাকুর। অন্য দিকে আরো একটা গল্প প্রচলিত আছে, সেটা হলো 

হিন্দুর অন্যতম তিন দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণ, মহেশ্বর। তার মধ্যে ব্রহ্মার মা বাবা ছিল না, সেই জন্য বলাহয় ব্রহ্মা হলো স্বয়ম্ভু । বলা হয়ে থাকে তিনি একবার ধ্যানে বসেন এবং তার সমস্ত ভালো গুনকে একসাথে করতে থাকেন, আর সেই সমস্ত ভালো গুন গুলো একসাথে হয়ে এক নারী আকার নেয় , আর এই ভাবেই সৃষ্টি হয় দেবী সরস্বতীর । বলা হয়ে থাকে ব্রহ্মার নাকি প্রথমে একটাই মুখ ছিল কিন্তু দেবী সরস্বতীকে দেখার পর আরো চারটি মুখের সৃষ্টি হয়।

পুরাণে আরো বলা হয় থাকে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করার পর সন্তুষ্ট হতে পারেননি ব্রহ্মা, দেবী সরস্বতী তাকে বিভিন্ন পরামর্শ দেন যাতে বিশ্বব্রহ্মন্ডকে আরো সুন্দর করে তোলা যায়। পুরাণের কোনো যায়গায় ব্রহ্মাকে দেবী সরস্বতীর স্বামী হিসেবে বলাহয়েছে । পুরাণের একটি গল্প আছে যে, কোনো এক অনুষ্ঠানে দেবী সরস্বতী ব্রহ্মা পাশে সময় মতো উপস্থিত হতে পারেননি, সেই সময় ব্রহ্মা নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী আরো একটি স্ত্রী সৃষ্টি করে নাম তার গায়েত্রী।

সেই দেখে রাগে দেবী সরস্বতী ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন, সেই অনুযায়ী ত্রিমূর্তি অন্যতম হলেও মর্ত্য লোকে তার পুজো হবে না । সেই অনুযায়ী বিষ্ণু আর মহেশ্বর পুজো হলেও ব্রহ্মার কিন্তু পুজো করা হয় না । আচ্ছা, দেবী সরস্বতী কে কেন বাগদেবী বলা হয় ? 

বহ্মা দেবী সরস্বতী কে এই নাম দিয়েছিলেন, কারণ শব্দ ও ভাষার উৎপত্তি তার থেকে তাই তিনি বাগদেবী। আরো একটা জিনিস লক্ষ্যনিয় দেবী সরস্বতীর কিন্তু কোনো মন্দির নেই , কেন নেই এই ক্ষেত্রে বলা হয় যে , মানুষের মুখ হল দেবী সরস্বতীর মন্দির, মানে আমার যে সব বর্ণ বা শব্দ বলি সেগুলি হলো সরস্বতী, সেই জন্য তিনি বাগদেবী । 


সরস্বতী কথাটির বুৎপত্তি গত অর্থ হলো সরস, মানে জল । আরো ভালো ভাবে বলতে গেলে দেখা যায়, সরস্বতী হল জলের দেবী । প্রাচীন কালে মানে সিন্ধু সভ্যতার আগেও সরস্বতী নদী ছিলো । প্রাচীন কালে থেকেই মানুষ প্রকৃতির পুজো করে , আর জলের বা নদীর পুজো করবেই এইটা স্বাভাবিক।

আবার মহাভারতের যুগে বলা হচ্ছে যে এই সরস্বতী নদী নাকি শুকিয়ে যায়।

বৈদিক যুগে নাকি এই সরস্বতী নদী দুই তীরে গড়ে ওঠেছিল, বিভিন্ন সভ্যতা আরো বলা হয় যে এই নদী সিন্ধু নদীর থেকে ও বড় ছিল । বলা হয়ে থাকে যে এই নদীর জলে নাকি ফসল খুব ভালো হতো , সেই জন্য সরস্বতী কৃষি কাজের ও দেবী হয়ে ওঠে । আবার এই নদীর জল ছিল ওতন্ত্য কার্যকরি সেই জন্য সরস্বতী ওষুধের দেবী হয়ে গেলেন। 

সরস্বতী নদী


তবে সরস্বতী নদী হারিয়ে গেলেও, ভারতের সংস্কৃতি সাথে রয়ে গেছে এই নদী , লোকবিশ্বাস অনুযায়ী গঙ্গা, যমুনা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরস্বতী আর ইলাহাবাদের প্রয়াগে তিনটি নদী মিলিত হয়েছে। গবেষকরা মনে করেন সরস্বতী খাইতে প্রবাহিত হত, প্রাচীন ভাগীরথি নদী , সেই জন্য বলে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূরে। দেবী সরস্বতী শাক্ত দেবী হিসাবে পরিচিত, কিন্তু দেবীর এই রুপটি চাপা পড়ে গেছে, তাই একটু মনে করিয়েদি পুরাণের একটি গল্পে বলা হয়েছে দেবী বৃত্র নামের একটি অসুর কে বধ করেছেন, এখানে তিনি ত্রিনয়না, তার বাহন রাজহাঁসের বদলে সিংহ । জানেন তো দেবী সরস্বতী বিষ্ণুপ্রিয়া নামেও পরিচিত, হ্যাঁ সাবাই রাধা কেই বিষ্ণুপ্রিয়া মনে করা হয় । এই নিয়ে গল্প আছে ব্রহ্মবৈবর্তো পুরাণের প্রকৃতি খন্ডে , গল্প টা এই রকম দেবী সরস্বতীর একবার ইচ্ছে হয় শ্রীকৃষ্ণ কে বর রুপে পাওয়ার জন্য, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ রাধা কে পছন্দ করে। তাহলে কি করা যায় শ্রীকৃষ্ণ দেবী সরস্বতী কে বলেন বিষ্ণু কে স্বামী রুপে গ্রহণ করতে, শ্রী কৃষ্ণ দেবী সরস্বতী কে বলেন যে মাঘ মাসের শুল্ক পঞ্চমী তোমাকে সবাই  পুজো করবে , আগে শ্রী পঞ্চমী তে দেবী লক্ষীর পুজো করা হতো, আর এখন দেবী সরস্বতীর পুজো । শুধুমাত্র বাংলা কিংবা ভারতবর্ষে ই দেবী সরস্বতীর পুজো করা হয় তা কিন্তু নয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে পুজো করা হয় দেবী সরস্বতীর। তিব্বত, মায়ানমার, জাপান, চীন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া পূজিত হন দেবী সরস্বতী । 


বৈদিক যুগে দেবী সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু বৈদিক যুগ বা মৌর্য আমলেও দেবী সরস্বতীর কোনো শিল্পকর্ম বা মূর্তি পাওয়া যায় না । কিন্তু মথুরায় একটা সরস্বতীর শিল্পকর্ম বা মূর্তি পাওয়া যায়, তাও আবার সেইটা পুরোটা পাওয়া যায় না, ঐ মূর্তি হাতে বই ধরা আর মনে করা হয় যে এইটা দেবী সরস্বতীর সবচেয়ে পুরোনো শিল্পকর্ম। মুম্বাই অঞ্চলে দেবী সরস্বতীর বাহন ময়ূর। কারণ হিসেবে বলাহয় পুরাতত্ত্ববিদ জেনারেল কানিংহাম মনে করেন , সরস্বতী নদীর তীরে অনেক ময়ূর দেখা যায়, সেই জন্য সরস্বতীর বাহন ময়ূর। 

দেবী সরস্বতী ও বাহন ময়ূর 


বৌদ্ধধর্মে ও দেবী সরস্বতীর উল্লেখ পাওয়া যায়। 

তিব্বতে সরস্বতীর নাম ইয়েং চেন মা , কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় চার হাতের সরস্বতী কে দেখা যায়, আর এখানেও দেবীর বাহন রাজহাঁস । থাইল্যান্ডে দেবীর গায়ের রং সবুজ আর বাহন ময়ুর । চীনে সরস্বতীর নাম বিয়ানসাইতিয়ান , আর জাপানে বেনজাইতেন । চীন এবং জাপানের উপকথা অনুযায়ী সরস্বতীর বাস জলে। চীনে দেবী সরস্বতী দন্ডনীতির দেবী আর জাপানে তিনি জলের দেবী।

ইয়েং চেন মা 

বিয়ানসাইতিয়ান


 বেনজাইতেন

ইন্দোনেশিয়া দেবী সরস্বতী 


অন্যদিকে মায়ানমারে দেবী কে থুরাথাডি এখানে তিনি গ্রন্থাগারের দেবী । 

থুরাথাডি

থাইল্যান্ডে দেবী সরস্বতী 

স্কন্দ পুরাণ অনুযায়ী দেবী পাতালে বাস করেন । সত্যি ভাবতেও অবাক লাগে তাইনা ? 

এবার বলি পুরোনো কলকাতায় বাবুদের সরস্বতী পুজো উদযাপন, তখনকার কলকাতায় সরস্বতী পুজো নিয়ে চলতো বাবুদের মধ্যে রেষারেষি ।

বাড়িতে বসতো ধ্রূপদী গানের আসর, এবং কবি গানের লড়াই । বলা হয় ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করার আগে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব জাঁকজমক করে সরস্বতী পুজো করতেন, শোনা যায় শহর কলকাতায় গেঁদা ফুল আর সন্দেশের আকাল দেখা দিত। 

চোরবাগানের রামচাঁদ শীলের পরিবারের ছোটদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত কার বই খাতা দেবী সরস্বতীর পায়ের কাছে থাকবে । 160 বছর পুরোনো এই পরিবারের সরস্বতী পুজোর আরো একটা আকর্ষণ হলো, সাদা তিল খোয়া খীর ও সন্দেশের তৈরি মিশ্রনের একটি মিষ্টি যার নাম ছিল তিলকুটো , বলা হয় এই মিষ্টি তৈরির জন্য সাদা তিল আসতো বাংলাদেশ থেকে । পুজোর আগের দিন রাতে থেকে চলতো মন্ডপ সাজানো। মন্ডপ জ্বালানো হতো হ্যাজকের আলো । সরস্বতী পুজো উপলক্ষে পাড়ায় পাড়ায় হতো নাটক অথবা থিয়েটার এখন তো এসব অতীত । বলা হয়ে থাকে প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর সময় শিকদার বাগানের একটি ক্লাবে আসতেন ছবি বিশ্বাস । কুমোরটুলির বিখ্যাত শিল্পী এন সি পালের তৈরি প্রতিমার দাম ছিল পয়ত্রিশ টাকা, তখন দিনে মানে 1935 সাল অনেক টাকা ছিল । পুজোয় বাজানো হতো গান , ছোট ছোট ক্লাব গুলিতে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হতো গ্রামোফোন আর রেকর্ড, আর অবস্থাপন্ন মানে ধনী ক্লাব গুলিতে গান বাজনা হত ভ্লাপ এম্পলিফায়ার দিয়ে ।

বিসর্জনের দিন কোন ক্লাবের প্রতিমা আগে যাবে সেই নিয়ে মাঝে মাঝে মারামারি বেঁধে যেত । বিসর্জনের দিন মূর্তি কাঁধে করে নিয়ে শোভাযাত্রা বের হতো , আর এই শোভাযাত্রা গুলি তো জ্বলত কার্বাইট গ্যাসের আলো আর থাকতো সং । এখন এই সব অতীত, সময়ের সাথে সাথে সব হারিয়ে গেছে । 

সুভাষচন্দ্র বসু 


বলা হয় যে কলকাতার আ্যলবর্ট হলে সরস্বতী পুজোর সমর্থনে সুভাষচন্দ্র বসু বক্তব্য রেখেছিলেন, আরো জানা যায় বন্দি অবস্থায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সরস্বতী পুজো করেছিলেন । 1923 সালে সুভাষচন্দ্র বসু কে বন্দি করে ব্রিটিশ সরকার, আর তার পরের বছরই মুর্শিদাবাদ পাঠিয়ে দেওয়া হয় সুভাষচন্দ্র কে। বহরমপুর জেলের সাত নম্বর ঘরে তিনি থাকতেন । সুভাষ ঠিক করলেন জেলে সরস্বতী পুজো করবেন, কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ না করে দেয় , কিন্তু উনি তো সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশ পুলিশ সামনেই করলেন সরস্বতী পুজো ।  


ছবি সূত্র - internet

তথ্য সূত্র - wikipedia


https://prohor.in/goddess-saraswati-is-worshiped-in-several-countries-outside-india


https://bartamanpatrika.com/detailNews.php?cID=32&nID=191861


https://www.anandabazar.com/editorial/how-the-goddess-of-knowledge-saraswati-named-after-the-name-of-the-river-saraswati-1.1099497


https://youtu.be/hNBm7mn7euI


https://youtu.be/IXpZOLh17To


https://youtu.be/QVUfa4gBpx4


https://tv9bangla.com/spiritual/how-goddess-saraswati-was-born-501862.html/amp#amp_tf=From%20%251%24s&aoh=16741509617697&referrer=https%3A%2F%2Fwww.google.com


https://drishtibhongi.in/2022/02/05/netaji-used-to-worship-devi-saraswati-during-his-imprisonment/


https://eisamay.com/astrology/satsanga/pravachan/story-of-goddess-saraswati-and-her-birth-story/articleshow/80849606.cms

Comments