আমাদের ভারত তথা কলকাতায় বিভিন্ন অঞ্চলে বা বলা ভালো জায়গায় ব্রিটিশ কিংবা ডেনিশ রা রীতিমতো নিজেদের জায়গা খুলে নিয়ে ছিল। হ্যাঁ তখন তো এইরকম ভারত ছিল না, তখন ছিল অন্যদের আধিক্যে। সেই সময় ডেনিশরা নিজের জায়গা খুলে নিয়ে ছিল আমাদের কলকাতায়। যার নাম ছিল denmark tavern বলে একটি হোটেল কিংবা রাত কাটানোর জায়গা। এই তথাকথিত হোটেল হয়েছিল এখনকার হুগলির শ্রীরামপুর এলাকায়, ভরতে ডেনিশ রা এসে উঠেছিলেন তামিলনাড়ু এলাকায় অবশ্য অনেকেই "নাড়ু" না বলে "নাডু"। তখন অবশ্য এর নাম ছিল ট্রাঙ্কাবার অঞ্চলে, সেই সময় ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি 1620 সাল নাগাদ ভারতে এসে পৌঁছায়। এখানে এই কথা বলা দরকার যে মাত্র দুবছরে ওভে গ্রাডে নেতৃত্বে তারা ভারতে পৌছেছিল, ওভে গ্রাডে এখনকার তামিলনাড়ু এসে তৈরি করেছিলেন ফোর্ট ডান্সবর্গ এবং এই ফোর্ট এখনো বিদ্যমান। তবে এখানে এসে ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুব একটা কিছু করতে পারেনি শুধু তাই নয় তাদের বিনিয়োগ সংস্থা বাজে ছিল এবং সেই সময় তাদের প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এমনকি সেই সময় ত্রিশ বছর যুদ্ধ চলছিল। এর থেকে প্রমাণিত যে শুধু মাত্র ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিংবা ব্রিটিশ সরকার প্রথম ভারতে এসে ছিল এই কথা ভুল। যাই হোক আসল কথায় ফিরে আসি ডেনিশদের ঐ কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে পড়ে যার ফলে তৎকালীন ডেনিশ রাজা ফ্রিডিক দুই সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে নেয়। তখন কিন্তু ডেনিশরা তাদের পাত্তরি গুটাইনি, এরপর ডেনিশ রাজপরিবার ও তামিলনাড়ু মধ্যে বানিজ্য শুরু হয়। দ্বিতীয় ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার শুরু হয় 1669 সালে এবং এরফলে তারা নতুন করে নিজেদের রাজত্ব সৃষ্টি করে তামিলনাড়ুর তিনটি গ্রাম তাদের দখলে চলে আসে এবং তারা বাংলায় তাদের প্রভাব ফেলে ফরাসি বসতি চন্দননগরের দক্ষিণ-পূর্বে তারা “ড্যানেমার্কসনাগোর” প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু 1714 সালের মধ্যে ড্যানেমার্কসনাগোর প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল এবং 1729 সালে কোম্পানিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ঐ বছরই তৈরি হয় এশিয়াটিক কোম্পানি, হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। এই এশিয়াটিক কোম্পানির মাধ্যমে ডেনিশদের রাজা ষষ্ট ক্রিশ্চিয়ান একটি কাগজে সই করেন আসলে সেখানে লেখা ছিল ভারত ও চীনে তারা চল্লিশ বছরের একচেটিয়া ব্যবসা করবে, এই লেখাটি সই হয়েছিল 1732 সালে 12 এপ্রিল। এই হিসেবে উইলিয়াম কেরি লিখছিলেন 1753 সালে ডেনিশরা চন্দননগর অঞ্চলে বসবাস ও ব্যবসা করে। তৎকালীন বাংলার নবাব এই ব্যবসার ব্যাপার টা ঠিক ঠিক ভাবে নেয়নি, এই কথা ডেনিশরা বুঝেছিলেন যার ফলস্বরূপ তারা নবাব এর সাথে কথা বলেন এবং নবাব ষাট বিঘা জমি ছেড়ে দেয়।তবে, জায়গাটি পরিদর্শন করার পর ড্যানিশ প্রধান সোয়েটম্যান বুঝতে পারেন যে শ্রীরামপুরে ৬০ বিঘা জমি দখল করা একটি ব্যয়বহুল প্রস্তাব হবে, কারণ এর জন্য প্রায় বারো হাজার টাকা মূল্যে এলাকার সমস্ত বাড়ি কিনে নিতে হবে। এটি প্রমাণ করে যে ড্যানিশরা যখন এসেছিল, ততদিনে শ্রীরামপুর ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। সোয়েটম্যান অবশেষে শ্রীরামপুরে নদীর তীরের তিন বিঘা এবং আরও ভেতরের দিকে আকনা নামক স্থানে সাতান্ন বিঘা জমি দখল করেন। 1755 সালের আটই অক্টোবর শ্রীরামপুরে প্রথমবারের মতো ড্যানিশ পতাকা উত্তোলন করা হয়। শ্রীরামপুর ছিল যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য অংশ, সেই সময় ইংল্যান্ড ও আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ জড়িয়ে পড়ে এই যুদ্ধে হ্যোলেন্ড এবং ফ্রান্স ও ছিল। এইসময় ব্রিটিশদের জাহাজ ভারতের সমুদ্র আসলে তৎকালীন জলদস্যু সেই জাহাজ কে আক্রমণ করে এবং সব কিছু লুঠ করে। তবে এই জলদস্যুরা ছিল প্রাইভেটিয়াররা এরা ছিল তথাকথিত ডেনিশ জলদস্যু। তবে এই বিষয়ে কিন্তু যেহেতু ডেনমার্ক এই সংঘাতে পক্ষ ছিল না, তাই ব্যবসায়ীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রীরামপুর থেকে ডেনীয় পতাকার অধীনে জাহাজ চালানো বেছে নেয়। যদিও এই বাণিজ্য ডেনীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য লাভজনক ছিল, তবে এটি তাদের প্রতিনিধিদের জন্য আরও বেশি লাভজনক ছিল, যারা মাসে দুইশ টাকার বেশি বেতন না পেয়ে “ডজন প্রতি 80 টাকায় শ্যাম্পেন পান করত”। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, একটি সামরিক সংঘাতই শ্রীরামপুরের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইউরোপীয় যুদ্ধগুলো উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো একে অপরের সাথে লড়াই করতে থাকে। পরবর্তী কালে ড্যানিশ নাগরিকরা শ্রীরামপুর এলাকায় নিজেদের একটি সরাইখানা খুলেছিল, এটা তখনকার ক্যাফে। এর টাকা গুলো সব ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিয়ে ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে এটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে সারা জীবন এর মতো বন্ধ হয়ে যায়নি সেই সময় ব্রিটিশদের এই কলকাতা তথা বাংলা তাদের রাজত্ব কায়েম করে এবং বলা হয় ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের রাজপুত্র জন পামার বাড়ি ছিল তৎকালীন লালবাজারে। তিনি ছিলেন ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রতিনিধি। একজন ইংরেজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পার এর আগে লন্ডন ট্যাভার্ন চালাতেন, সম্ভবত কলকাতায়। উইলিয়াম কেরি লিখেছেন যে, শ্রীরামপুরে মিস্টার মেয়ার্স নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন আরেকটি সরাইখানা ছিল। “নদীপথে ভ্রমণ...আনন্দের জন্য বেড়াতে যাওয়া সেই সময়ে একটি খুব সাধারণ প্রথা ছিল। বড় বড় দল ব্যান্ডেল এবং নদীর ধারের অন্যান্য স্টেশন পর্যন্ত যেত...সুতরাং শ্রীরামপুরের মতো পথের ধারের সরাইখানা ভ্রমণকারীদের জন্য নিশ্চয়ই একটি দারুণ ব্যাপার ছিল”। 1786 সালের মার্চের 16 তারিখের কলকাতা গেজেটে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন থেকে আমরা ডেনমার্ক ট্যাভার্নের নিম্নলিখিত সুযোগ-সুবিধাগুলোর উল্লেখ পাই – “নদীপথে যাতায়াতকারী ভদ্রলোকদের জন্য সকালের জলখাবার, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার এবং থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, এবং এর খরচ যে খুবই সুলভ হবে, সে বিষয়ে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন… অল্প সময়ের নোটিশে রাতের খাবার তৈরি করে পরিবেশন করা হয়; এছাড়াও নগদ টাকায় এক ডজন করে মদ বিক্রি করা হয়। একটি ভালো বিলিয়ার্ড টেবিল এবং কফি-রুমের সাথে সংবাদপত্র ইত্যাদিও রয়েছে”। পারের উদ্যোগ যে সফল ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায় কারণ 1788 সালের এপ্রিল মাসের তিন তারিখ একই প্রকাশনায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি শুরু হওয়ার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই সুপরিচিত হয়ে উঠেছিল। এই সময়ে মালিকানা বদল হয়েছিল এবং ইংরেজ জন নিকোলস, যিনি পূর্বে কলকাতায় হারমোনিক ট্যাভার্ন চালাতেন, যা এখনকার লালবাজার পুলিশ সদর দপ্তরের জায়গায় একসময় ছিল। কলকাতা পুলিশের এখন লালবাজারের ভেতরে একটি লাউঞ্জ আছে, যেটিকে তারা মূলটির স্মৃতিতে হারমোনিক ট্যাভার্ন বলে ডাকে। ডেনমার্ক ট্যাভার্ন কখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তা অজানা, তবে সম্ভবত উনিশ শতকের গোড়ার দিকে শ্রীরামপুর যখন একটি শিল্প শহর এবং পাট উৎপাদনের কেন্দ্রে রূপান্তরিত হচ্ছিল, তখন এটি ঘটেছিল । ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করছিল এবং ভবনটিকে তার পূর্বের রূপ ও উদ্দেশ্যে পুনরুদ্ধার করার জন্য তারা সেখান থেকে সরে যেতে রাজি হয়েছিল, যদিও পুলিশ এখনও ভবনটির একটি অংশ ব্যবহার করে।
ছবি সূত্র - internet
তথ্য সূত্র - The Concrete Paparazzi: Serampore's Danish Tavern Re-opens https://share.google/SjZkrV2NpQ3bxSWpj

Comments