![]() |
| দশঘরা গ্রাম |
আমাদের কলকাতায় একসময় বিভিন্ন গ্রাম এবং এখন গ্রাম কিন্তু আছে, হয়তো কোনো সময় গ্রাম গুলি মফসল বা তথাকথিত শহরে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো দশঘরা গ্রাম। এটি এমন একটি গ্রাম যেখানে পরিনত হয়েছে বিভিন্ন জায়গা এখানে রয়েছে ছোট ছোট নদী, ভিক্টোরিয়ার আমলের ইটের তৈরি দরজা বা বলা ভালো গেট এছাড়া রয়েছে ইউনিয়ন স্টাইলের বাড়ি আরো অনেক কিছু। যদি সময় হিসেবে দেখা যায় তাহলে অন্তত আটশো বছর পুরনো এই গ্রাম। এখন অনেক জানতে চাইবেন যে গ্রাম টা, এটি হলো হুগলি জেলার 65 কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। এই দশঘরা গ্রামের কথা উল্লেখ আছে ঐতিহাসিক সুধীরকুমার মিত্র তাঁর 'হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ' ও নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর 'হুগলি জেলার পুরকীর্তি' তারা দুজনেই উল্লেখ করেছেন যে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বছর আগে দশঘরা অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। দামোদরের পাড় ছিল বিমলা ও কানন্দি অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিন্তু দামোদরের পাড় এখানে আটকে গেছিল যার উপরুক্ত দুই নদী এই দামোদরের মধ্যে মিশে যায়। এবার বলি এই দশঘরা গ্রামের কথা, এই গ্রাম ছিল তৎকালীন সময়ের রাজা বারোদুয়ারির রাজধানী। তিনি এখানে একটি বিশালক্ষি দেবীর মন্দির তৈরি করেন এই কথা বলা হয় যে এখানে বিভিন্ন রাজপ্রাসাদ, মন্দির এবং আরো অনেক কিছু তৈরি করেন। শুধু তাই নয় মন্দির পাশে একটি পুকুর ছিল যার নাম দেওয়া হয় বিশালক্ষি পুকুর। কিন্তু সময় তো সব সময় এক যায় না, এখানে তাই হয়েছিল আসতে তার এই রাজধানী ধ্বংস হয়ে যায়। দেখা যায় রাজা তার রাজধানী মেদেিনীপুরে দিকে চলে যায়। আর এখানে বিমলা ও কানন্দি নদী শুকিয়ে জেতে শুরু করে সেখানে আস্থে আস্থে পলি জমতে শুরু করে এবং এখানে একটি জমি সৃষ্টি হয়। এখন যদি আপনাদের মনে প্রশ্ন আসে তাহলে কী দশঘরা গ্রাম একটা কাল্পনিক গ্রাম না? না দশঘরা গ্রাম সত্যি ছিল এবং এখনো আছে এই গ্রামের সৃষ্টি হয়েছিল। দশঘরা ছিল কয়েকটি গ্রামের সমষ্টি, অর্থাৎ আগলাপুর, দিঘরা, গঙ্গেশনগর, গোপীনগর, ইছাপুর, জরগ্রাম, নলথোবা, পারাম্বো, শ্রীকৃষ্ণপুর এবং শ্রীরামপুর। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে দশঘরা একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। এবার বলি আঠেরো শতকের কথা, এই বারোদুয়ারি রাজ পরিবারের সদস্যরা এখানে এসে বেশ ভালো মতো বসতি স্থাপন করে। প্রথমে জগোমহন দেব বিশ্বাস এবং পরবর্তীতে রামনারায়ণ পাল চৌধুরীর উদ্যোগে এখানে একটি বিশেষ ঘর বা বলা ভালো তৈরি হয়। জগমোহন দেব-বিশ্বাসের পিতা শ্রীচৈতন্যের প্রবীণ সমসাময়িক অদ্বৈত আচার্যের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। স্যার অমিয় কুমার ব্যানার্জী তাঁর 'ওয়েস্ট বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স: বই তে উল্লেখ করেছেন যে “জগমোহনের পুত্র রামমোহন ছিলেন একজন বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর অসংখ্য দানশীলতার ফলে তিনি দশঘরা সমাজের নেতৃত্ব লাভ করেন এবং এই শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর বংশধরেরা দীর্ঘকাল ধরে বজায় রেখেছিলেন।” এরপর বিশ্বাস পরিবার এই অঞ্চলের অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন। তারা নিজেদের রাজত্ব কায়েম করার জন্যে তাদের নামে একটি নতুন স্টাইল আনেন, যাছিল ভিক্টোরিয়ান স্টাইল। তারা গোপাইসাগর লেক কে তাদের অন্যতম করে তোলেন এবং তৈরি হয় বিশ্বপাড়া। এই লেক ঘিরে তাদের একটি বাড়ি তৈরি হয় এবং শোনা যায় বাড়িটির প্রতিটি ভাগে একটি করে চিহ্ন লাগানো হয়েছিল সেগুলো হলো ঘোড়া। এই বাড়িটি তৎকালীন কাছাড়ি বাড়ি।
আগে এই বাড়িটি তে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ কর্ম পালন করা হতো, কিন্তু পৃরবর্তী কালে এখানে শুধু মাত্র অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এই অংশ টি উল্লেখ্য যোগ্য ভাবেই দুর্গাপুজোর সময় ব্যবহার হয়, এই রাজকীয় বারান্দাটি ছয়টি উঁচু স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাদা ও লাল রঙে রাঙানো দোতলা এই কাঠামোটিতে একটি ঝুলন্ত বারান্দা রয়েছে। উপরের তলার করিডোরটি লোহার রেলিং ও সবুজ রঙে সজ্জিত, আর প্রধান প্রবেশদ্বারটি একটি উঠোনে গিয়ে শেষ হয়েছে। এবার বলি দুর্গা পুজোর কথা, এমনিতেই সাজো সাজোরব কদিন পরেই পুজো তাই বলে রাখা ভালো যে এখানে নাট মন্দির রয়েছে সেটি সাজানো হয়েছে ভিক্টোরিয়ার পিলার দিয়ে, এই জায়গাটি সবসময় দেবী দুর্গার জন্য সজ্জিত করা হয়। এই বিশ্বাস পরিবার প্রতিবার পুজো করে এবং তাদের আলাদা একটি দুর্গার স্টাইল আছে। বিশ্বাস পরিবারে মা দুর্গার কিন্তু চারটে হাত এই দুর্গা কে বলা হয় জয়দুর্গা বলা হয়। তিনি প্রতিটি হাতে একটি করে সাপ, ত্রিশূল , তলোয়ার ও ঢাল ধারণ করেন। বিশ্বাস পরিবার একটি রথযাত্রাও বের করে, যেখানে রাধা-গোবিন্দ জিউ-এর বিগ্রহ নয়টি চুড়াযুক্ত রথে স্থাপন করা হয় । বিশ্বাস পরিবারের দ্বারা প্রবর্তিত এই রথযাত্রা দশঘরার অন্যতম প্রধান উৎসব, যেখানে একটি মেলা বসে এবং তাতে সমগ্র বাংলা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। এই চত্বরে আরও অন্যান্য সুন্দর স্থাপত্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে বৈঠকখানা , চারকোণা দোলমঞ্চ, নয়টি চূড়াবিশিষ্ট অষ্টভুজা রাসমঞ্চ এবং পোড়ামাটির গোপীনাথ মন্দির আজও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। দোলমঞ্চ হলো একটি উঁচু বেদীর উপর নির্মিত মন্দির-সদৃশ কাঠামো, যেখানে দোল পূর্ণিমা বা হোলি উপলক্ষে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ পুজার জন্য স্থাপন করা হয়। নিকটবর্তী সাদা অষ্টভুজাকৃতি রাসমঞ্চ , যা খিলানযুক্ত একটি বৃহত্তর মন্দির, সেখানে কার্তিক পূর্ণিমার শুভ দিনে রাস উৎসবের সময় পুজার জন্য রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ রাখা হয়। কাছাকাছি একটি আটচালা (আট কার্নিশযুক্ত) শিব মন্দিরও রয়েছে, কিন্তু এর দেয়ালে কোনো পোড়ামাটির কাজ নেই এস্টেটটিতে আরও কিছু ভবন আছে, যেগুলো পরে নির্মিত হয়েছিল এবং যেখানে বিশ্বাস পরিবার বাস করে। দুর্গাপূজা, রথযাত্রা , রাস উৎসব, দোল উৎসব, জন্মাষ্টমী এবং ঝুলন উৎসবের সময় বিশ্বাস পরিবারের উদ্যোগে বিশ্বপুরা উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে, যেখানে তাঁরা সবাইকে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তবে এইটা ছিল একটা অংশ বাকিটা ও আসবে ....
ছবি সূত্র - internet
তথ্য সূত্র - YouTube video
এবং Dasghara: Be Alice for a Day https://share.google/o4wBBl2vyojwvKedn


Comments