ম্যাকেনজি সাহেবর গুপ্তধন

ম্যাকেনজি সাহেব এর কবর 

হয়তো এখন আমরা সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রি নিয়ে বিভিন্ন কথা বলি, তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে বেশিরভাগ মানুষ এই কবরস্থান দেখতে যায়। তবে এইখানে বিভিন্ন মানুষের সমাধি রয়েছে। তার মধ্যে একজনের কথা আগেই বলেছি, এইবার আর একজনের কথা বলবো। এনি হলেন কলিন ম্যাকেনজি। এনার ছোট বেলা কেটেছিল স্কটল্যান্ডে। এনার বাবার নাম জানা যায় মুরডক ম্যাকেনজি, ইনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। এই ম্যাকেনজি সাহেব প্রথমদিকে একজন কাসটোমসের একজন স্টোরওয়ে অফিসার ছিলেন 1778 থেকে 1783 অব্দি। ছোটবেলায় তিনি অঙ্কে পারদর্শী ছিলেন এর জন্য দায়ী তার শিক্ষক অ্যাল্যকজান্ডার অ্যান্ডারসন, তিনি একজন অধ্যাপক এবং ফ্রিম্যানসর ছিলেন। এই ম্যাকেনজি সাহেব ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ম্যাড্রাস কোম্পানি যোগ দেন 1783 সালে। এর আগে উনি ক‌্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, তবে আস্তে আস্তে তার অ্যান্টিক জিনিস প্রতি তার যোগাযোগ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে তার যোগাযোগ বাড়তে তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর। তার মিলিটারি সংস্থায় কর্মরত থাকার জন্য তিনি তেরো বছর সময় ধরে ব্যাস্ত ছিলেন, শুধু তাই নয় তার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তে চাকরির জন্য তিনি 1783 সালে দুই জায়গায় তার কর্মক্ষেত্র শুরু করেন প্রথমে কোয়েমবাটুর ও দিন্দিগুলে তার কর্মক্ষেত্র ছিল, হয়তো অনেক জানতে চাইবেন এই দিন্দিগুল অঞ্চলটি কথায়, তাদের কে বলছি এটি তামিলনাড়ু একটি জায়গা। ম্যাকেনজি সাহেব এর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিউটি পড়েছিল মদ্রাস, নেল্লোর, গুন্টুর ও মাইসুরে 1790 থেকে 1792 সালে। তিনি পন্ডিচারি অবরোধের সময়ে ব্রিটিশ সরকার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, শুধু তাই নয় তিনি 1783 সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, 1789 সালে ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট, 17930সালে ক্যাপ্টেন, 1806 সালে মেজর এবং সবশেষে 1819 সালে কর্নেল পদে উন্নীত হন। তিনি যখন সিংহল অর্থাৎ এখন শ্রীলঙ্কা থেকে ফিরে তিনি তার পুরাত্বিক কাজে আরও নিয়েজিত করে। 1799 সালে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি টিপু সুলতানের রাজত্ব দখল করার জন্য শ্রীরঙ্গপতম দখল করে, সেখানে ম্যাকেনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। 

ম্যাকেনজি সাহেব ওরফে লেফটেন্যান্ট কর্নেল কলিন ম্যাকেনজি


যখন টিপু সুলতান যখন মাইসুরের নবাব ছিল সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি টিপু সুলতান হারায় এবং তার রাজত্ব দখল করে, সেই সময় তিনি 1799 থেকে 1810 সালের মধ্যে মহীশূর জরিপের নেতৃত্ব দেন, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের সীমানা এবং নিজামের ছেড়ে দেওয়া অঞ্চলগুলো প্রতিষ্ঠা করা। এই জরিপে দোভাষী, নকশাকার ও চিত্রকরদের একটি দল ছিল, যারা অঞ্চলটির প্রাকৃতিক ইতিহাস, ভূগোল, স্থাপত্য, ইতিহাস, রীতিনীতি এবং লোককথার উপর তথ্য সংগ্রহ করেছিল। এই ম্যাকেনজি সাহেব যখন তার জরিপ করার কাজ শুরু করেন, তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে তার ভারতীয় ভাষায়র প্রতি কোনো জ্ঞান নেই। তিনি বুঝতে পারেন সেই সময় ব্রিটিশদের ভারতীয় ভাষার প্রতি কোনো উপলব্ধি ছিল না এমনকি দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার ক্ষেত্রে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কোনো উপলব্ধি ছিল না। এর কিছুদিন পরই বা বলা ভালো সেই সময় উইলিয়াম ল্যামববটন কর্তৃক ভারতের একটি ট্রিগোনোমেটিক জরিপ করার প্রস্তাব পেশ করা হয়। কিন্তু দেখা যায় যে মহীশূর জরিপ করার সময় উল্লেখিত দুই পক্ষের মধ্যে যথেষ্ট সমঝোতার অভাব ছিল, শুধু তাই নয় ম‌্যাকেনজি এই কথা উল্লেখ করেছেন যে তার জমি জরিপে কাজ যেন শুধু মাত্র সামরিক ও ভৌগলিক তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। তার সীমানা যেন পুরো দেশের মধ্যে বিভক্ত হয়, এই বিষয় নিয়ে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এই বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ রসদ দেওয়ার কথা সেটা পায়নি ম্যাকেনজি সাহেব। এর পরবর্তীকালে ম্যাকেনজি সাহেব তার একজন দোভাষী কে নিয়োগ করেন, তার নাম ছিল কাবভেলি ভেঙ্কট বড়ুয়া ইনি পরবর্তী সময়ে ম্যাকেনজি সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই ভারতীয় চারটি ভাষার অর্থাৎ তামিল, তেলেগু, সংস্কৃত ও কন্নড় ভাষা গভীরভাবে জানতেন। এই ভারতীয় সমাজের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে সাবলীল ভাবে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। 1797 সাল নাগাদ ম্যাকেনজি সাহেব মুদাগেরি তে গেছিলেন, সেখানে তিনি জৈন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান, সেখানে তিনি জৈন ধর্ম এবং মন্দির সম্পর্কে তার মত ব্যাক্ত করেন। সেটা তিনি করেছিলেন তার দোভাষী মাধ্যমে আরো জানা যায় যে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নেন এবং জৈন ধর্মলম্বীদের একটি টীকা রচনা করেন এর সাথে তিনি এ অঞ্চলের শীলালিপি বিষায়ক একটি গবেষণা পত্র রচনা করেন, যা একটি অসামতান্য আবেদন রাখার একটি প্রক্রিয়া ছিল। যত সময় এগিয়েছে ততই ম্যাকেনজি সাহেব তার জমি জরপ করার ক্ষমতা এগিয়েছে, শুধু তাই নয় তিনি বিপুল পরিমাণ ছবি ও নকশার একটি বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলো অমরাবতিতে আঁকা 85 রেখাচিত্রের একটি সেট। মনে করা হয় তিনি প্রথম স্থান গুলি দেখেন 1798 সালে, তবে মনে করা হয় যে তিনি যখন সার্ভেয়র জেনারেল ছিলেন অর্থাৎ 1818 থেকে 1820 সময়ে তিনি আরো সুসংবদ্ধ ভাবে গবেষণা পরিচালনা করেন। জানা যায় তার নথিপত্র গুলির তিনটে অনুলিপি রয়েছে, তার মধ্যে একটি এশিয়াটিক সোসাইটি কলকাতায় এবং দ্বিতীয়টি রয়েছে এখনকার চেন্নাই বা সেকালের মাদ্রাজে এবং শেষ অংশটি পাওয়া যায় লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরী তে। আগে যেই দুই জায়গার কথা বেলেছিলাম সেখানে আদেও ওগলি পাওয়া যায় না। শুধু মাত্র ব্রিটিশ লাইব্রেরী তে এগুলি পাওয়া যায়। সেই সময় ম্যাকেনজি সাহেবের কাজ গুলো করেছিলেন জন নিউম্যান তিনি 1818 থেকে 1810 অব্দি ড্রাফটম্যান ছিলেন। ম্যাাকেনজি সাহেব 132টি পাথর খুঁজে পেয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো হদিশ নেই, সাহেব নিজে মনে করতেন যে ওগুলো জৈন ধর্মের সম্পিকিত কিন্তু তিনি বৌদ্ধ ধর্মের সাথে ভারতের যে একটা সম্পর্ক আছে সেটা তিনি মেনে নিতে পারেনি। অমরাবতী থেকে যে পাথর গুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলো জাহাজে তোলা হয়নি শুধু তাই নয় পাথর গুলোকে মাসুলিপট্টমে রেখে দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীকালে মাসুলিপট্টমের কার্যকারী সাহেব ফ্রান্সিস ডাব্লিউ রবার্টসনের নামে নামাঙ্কিত হয়ে যায়। কারণ 1810 1817 অব্দি তিনি এখানে কাজ করেছিলেন। জানা গেছে 79 টা ম্যাকেনজি সাহেবের তৈরি করা ছবি আর পাওয়া যায় নি, এখন যেকটি ছবি আমরা লন্ডন মিউজিয়ামে দেখতে সেগুলি কে বলা হয় অমরাবতী মার্বেল। ম্যাকেনজি সাহেব কিন্তু লন্ডনের মাটিতে দেহত্যাগ করেন নি তিনি তৎকালীন কলকাতায় দেহত্যাগ করেন 1821 সালের মে মাসের 8 তারিখে। ম্যাাকেনজিসাহেবের বিধবা স্ত্রী ম্যাকেনজি সাহেবের প্রত্নসম্পদের ভান্ডার টি তৎকালীন বাংলার সরকার কে তিনি কুঁড়ি হাজার টাকায় বিক্রি করতে চেয়েছিলেন তবে সেটা বিক্রি হয়েছিল কী না সেটা উল্লেখ পাইনি বরং পামার অ্যান্ড কোম্পানি তৎকালীন বাংলার সরকার সাথে একটি যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকার একটি শর্ত নির্ধারণ করে। পরবর্তীকালে বাংলার সরকার প্রত্নসংগ্রহ টি কিনে নেয়। বর্তমান সময়ে ম‌্যাকেনজি সাহেবের প্রত্নসম্পদের ভান্ডার টি দেখতে পাবেন ব্রিটিশ লাইব্রেরীর ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড ইন্ডিয়া অফিস কালেকশনে তবে এখনো কিছু কালেকশন রয়েছে চেন্নাই মিউজিয়ামে। তবে সাহেবর কবর রয়েছে আমাদের কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে।

ছবি - internet 

তথ্য - https://kevinstandagephotography.wordpress.com/2023/05/23/guide-to-south-park-street-cemetery-kolkata/



Comments